বাংলা গুরুকুল, GOLN

যেকোনো জীবন্ত ভাষার অন্যতম প্রধান বৈশিষ্ট্য হলো তার পরিবর্তন ও বিবর্তন। বাংলা ভাষাও এর ব্যতিক্রম নয়। হাজার বছরের পুরোনো এই ভাষার রূপ, ধ্বনি ও লেখ্য রীতি কালপরিক্রমায় নানাভাবে পরিবর্তিত হয়েছে। ভাষার একটি সুশৃঙ্খল ও সর্বজনীন লিখিত রূপ প্রদানের জন্য ‘বাংলা বানান সংস্কার’ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি ভাষাতাত্ত্বিক পদক্ষেপ। এটি কেবল বর্ণগুলোকে সাজানোর বিষয় নয়, বরং ভাষার অন্তর্নিহিত ধ্বনিতত্ত্ব, ব্যুৎপত্তি এবং আধুনিক প্রয়োগের মধ্যে একটি বৈজ্ঞানিক মেলবন্ধন তৈরির প্রক্রিয়া।

বাংলা বানানের ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট: মুদ্রণযন্ত্রের সূচনা থেকে আধুনিক যুগ

বাংলা বানান ও বর্ণমালাকে সুস্থিত এবং সামঞ্জস্যপূর্ণ করার প্রথম সুসংগঠিত প্রয়াস লক্ষ করা যায় আঠারো শতকের শেষভাগে। ১৭৭৮ সালে প্রকাশিত নাথানিয়েল ব্রাসি হ্যালহেড (Nathaniel Brassey Halhed)-এর ‘এ গ্রামার অফ দ্য বেঙ্গল ল্যাঙ্গুয়েজ’ (A Grammar of the Bengal Language) গ্রন্থের মাধ্যমে বাংলা বর্ণমালার আধুনিক যুগের সূচনা ঘটে।
চার্লস উইলকিন্স এবং পঞ্চানন কর্মকার যখন প্রথম বাংলা চলনশীল হরফ (Movable type) বা বর্ণমালার ছাঁচ তৈরি করেন, তখন থেকেই বাংলা বানানকে একটি সুনির্দিষ্ট কাঠামোর আওতায় আনার প্রয়োজনীয়তা দেখা দেয়। তবে সে সময় ভাষাবিদদের মনোযোগ বর্ণের কাঠামোগত রূপের চেয়ে বানানের ওপরই বেশি নিবদ্ধ ছিল।

সংস্কৃত অনুশাসন বনাম উচ্চারণের দ্বন্দ্ব

উনিশ শতকের শুরুর দিকে বাংলা গদ্য সাহিত্যের উন্মেষ ঘটলে, বাংলা বানান মূলত সংস্কৃত ব্যাকরণের অনুশাসন দ্বারা নিয়ন্ত্রিত হতে থাকে। ফলে ব্যুৎপত্তিনির্ভর (Etymology-based) একটি কঠিন মানদণ্ড প্রতিষ্ঠিত হয়।
কিন্তু বাংলা ভাষার নিজস্ব প্রকৃতি সংস্কৃত থেকে ভিন্ন। বাংলা ভাষায় বিপুল পরিমাণ তৎসম (সংস্কৃত) শব্দের পাশাপাশি অর্ধ-তৎসম, তদ্ভব, দেশি এবং বিদেশি শব্দের সংমিশ্রণ রয়েছে। ব্যুৎপত্তিনির্ভর বানানরীতির কারণে আমরা লিখতাম সংস্কৃত রীতিতে, কিন্তু উচ্চারণ করতাম বাংলার নিজস্ব ভঙ্গিতে। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর এই দ্বন্দ্বের তীব্র সমালোচনা করে ১৯৩৮ সালে বলেছিলেন, “বানানের ছদ্মবেশ ঘুচিয়ে নিলেই দেখা যাবে বাংলায় তৎসম শব্দ নেই বললেই হয়।”
গুরুত্বপূর্ণ নোট: কোনো ভাষার বানানই শতভাগ ‘বিজ্ঞানসম্মত’ হওয়া সম্ভব নয়। ভাষাবিজ্ঞানের দৃষ্টিকোণ থেকে, যে বানানটি একটি নির্দিষ্ট সময়ে ভাষাগোষ্ঠী কর্তৃক সর্বজনীনভাবে গৃহীত ও প্রমিত হিসেবে স্বীকৃত, সেটিই শুদ্ধ। যুক্তিসংগত হলেও মান্য রীতি বহির্ভূত বানান অশুদ্ধ হিসেবেই গণ্য হয়।

বানান সংস্কারের বিভিন্ন পর্যায় ও প্রাতিষ্ঠানিক উদ্যোগ

সময়ের সাথে সাথে সাধু রীতির নির্মোক ত্যাগ করে চলিত রীতি যখন সাহিত্যের প্রধান মাধ্যম হয়ে ওঠে, তখন বাংলা বানানে চরম বিশৃঙ্খলা দেখা দেয়। একই শব্দের একাধিক বানান বিভ্রান্তির সৃষ্টি করে। এই বিভ্রান্তি দূর করতে বিভিন্ন যুগে প্রাতিষ্ঠানিক উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়।

১. বিশ্বভারতী ও কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের বানান বিধি

বিশ শতকের বিশের দশকে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের প্রত্যক্ষ নির্দেশনায় ‘বিশ্বভারতী’ প্রথম বাংলা বানানের একটি নিয়ম নির্ধারণের চেষ্টা করে। পরবর্তীতে ১৯৩৬ সালে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় ‘বাংলা বানানের নিয়ম’ চূড়ান্তভাবে প্রণয়ন করে। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়, ভাষাচর্য সুনীতিকুমার চট্টোপাধ্যায়সহ সে সময়ের শীর্ষস্থানীয় পণ্ডিতরা এই বিধি সমর্থন করেন। আধুনিক বাংলা বানানের প্রথম সার্থক ও বিজ্ঞানভিত্তিক ভিত্তিপ্রস্তর ছিল এই উদ্যোগ।

২. বাংলাদেশে বানান সংস্কার: এনসিটিবি (NCTB) ও বাংলা একাডেমি

১৯৪৭ সালের পর তৎকালীন পূর্ববঙ্গে এবং স্বাধীন বাংলাদেশে একাধিকবার বানান সংস্কারের উদ্যোগ নেওয়া হয়।
  • জাতীয় শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যপুস্তক বোর্ড (NCTB): ১৯৮৮ সালে একটি বিশেষজ্ঞ কমিটির মাধ্যমে পাঠ্যপুস্তকের জন্য বাংলা বানানের একটি সুনির্দিষ্ট খসড়া প্রস্তুত করা হয়।
  • বাংলা একাডেমি প্রণীত প্রমিত বাংলা বানান: ১৯৯২ সালে বাংলা একাডেমি একটি যুগান্তকারী উদ্যোগ গ্রহণ করে এবং কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় ও এনসিটিবি-র নিয়মের সমন্বয় ঘটিয়ে ১৯৯৪ সালে ‘প্রমিত বাংলা বানানের নিয়ম’ প্রকাশ করে। পরবর্তীতে ২০১২ সালে এর একটি পরিমার্জিত সংস্করণ প্রকাশিত হয়, যা বর্তমানে বাংলাদেশে বাংলা বানানের সর্বোচ্চ মানদণ্ড হিসেবে অনুসৃত।

বাংলা একাডেমি প্রণীত প্রমিত বানানের মূলনীতি

বাংলা বানানের সমতাবিধানের জন্য বাংলা একাডেমি যে নিয়মগুলো প্রবর্তন করেছে, তার মধ্যে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ও বহুল ব্যবহৃত কয়েকটি নিয়ম নিচে আলোচনা করা হলো:
  • ই-কার (ি) এবং উ-কার (ু) এর ব্যবহার: তৎসম শব্দ ব্যতীত সকল তদ্ভব, দেশি, বিদেশি ও মিশ্র শব্দে কেবল হ্রস্ব ই-কার (ি) এবং হ্রস্ব উ-কার (ু) ব্যবহৃত হবে। যেমন: পাখি, বাড়ি, গাড়ি, সরকারি, একাডেমি, খুশি। (পূর্বে এগুলোতে দীর্ঘ ঈ-কার ব্যবহৃত হতো)।
  • বিদেশি শব্দে ‘ষ’ ও ‘ণ’ বর্জন: বিদেশি ভাষার (ইংরেজি, আরবি, ফারসি ইত্যাদি) শব্দ বাংলায় লেখার সময় কখনোই মূর্ধন্য-ষ বা মূর্ধন্য-ণ ব্যবহৃত হবে না। যেমন: স্টেশন, মাস্টার, কর্নার, হর্ন
  • রেফ (র্)-এর পর ব্যঞ্জনবর্ণের দ্বিত্ব বর্জন: কোনো বর্ণে রেফ থাকলে সেই বর্ণের দ্বিত্ব (দুইবার উচ্চারণ বা লেখা) হবে না। যেমন: কর্ম (কর্ম্ম নয়), সূর্য (সূর্য্য নয়), ধর্ম (ধর্ম্ম নয়)
  • ও-কার (ো) এর ব্যবহার: অনুজ্ঞাবাচক ক্রিয়াপদ এবং কিছু বিশেষ্য/বিশেষণ শব্দে ও-কার যুক্ত হবে, যাতে অর্থের বিভ্রান্তি না ঘটে। যেমন: করো, পড়ো, বলো, ভালো, কালো

তৎসম বনাম অতৎসম শব্দের বানানে তুলনামূলক বিশ্লেষণ

বাংলা বানানের সবচেয়ে বড় বিভ্রান্তি তৈরি হয় তৎসম (সংস্কৃত মূল) এবং অতৎসম (তদ্ভব, দেশি, বিদেশি) শব্দের বানানের নিয়মে। নিচে একটি তুলনামূলক টেবিলের মাধ্যমে বিষয়টি স্পষ্ট করা হলো:
বিবেচ্য বিষয়তৎসম (সংস্কৃত) শব্দের নিয়মঅতৎসম/বিদেশি শব্দের নিয়মবাস্তব উদাহরণ
ণত্ব বিধানঋ, র, ষ-এর পর মূর্ধন্য-ণ হয়।কখনোই মূর্ধন্য-ণ হয় না, দন্ত্য-ন হয়।তৎসম: কারণ, বরণ। বিদেশি: কোরআন, ফার্নিচার
ষত্ব বিধানট-বর্গীয় ধ্বনির আগে মূর্ধন্য-ষ হয়।কখনোই মূর্ধন্য-ষ হয় না, দন্ত্য-স বা তালব্য-শ হয়।তৎসম: কষ্ট, বৃষ্টি। বিদেশি: স্ট্যান্ড, মাস্টার
দীর্ঘ স্বরের প্রয়োগসংস্কৃত ব্যাকরণ অনুযায়ী ঈ-কার (ী) বা ঊ-কার (ূ) বসতে পারে।সর্বদা হ্রস্ব ই-কার (ি) বা হ্রস্ব উ-কার (ু) বসবে।তৎসম: নারী, তরী। অতৎসম: দাবি, হাতি, জরুরি
টিপস (Tip Box):
বানানের বিভ্রান্তি এড়ানোর সবচেয়ে সহজ উপায় হলো শব্দটির উৎস সম্পর্কে প্রাথমিক ধারণা রাখা। শব্দটি যদি ইংরেজি বা আরবি-ফারসি থেকে এসে থাকে, তবে চোখ বন্ধ করে তাতে ‘ি-কার’ (হ্রস্ব-ই) এবং দন্ত্য-স/দন্ত্য-ন ব্যবহার করুন। যেমন: জানুয়ারি, লাইব্রেরি, ফটোস্ট্যাট

ডিজিটাল যুগে বাংলা বানান: প্রযুক্তির প্রভাব ও ভবিষ্যৎ

একুশ শতকে বাংলা ভাষা সম্পূর্ণভাবে ডিজিটাল জগতে প্রবেশ করেছে। ইউনিকোড (Unicode) আসার পর ইন্টারনেটে বাংলা লেখার বৈপ্লবিক পরিবর্তন ঘটেছে। অভ্র (Avro), রিদ্মিক (Ridmik)-এর মতো কীবোর্ড এবং বিভিন্ন কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (AI) চালিত স্পেল চেকার (Spell Checker) বর্তমানে প্রমিত বাংলা বানান সংরক্ষণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে।
তবে, সোশ্যাল মিডিয়া এবং দ্রুত মেসেজিংয়ের যুগে ‘বাংলিশ’ (Banglish) বা রোমান হরফে বাংলা লেখার প্রবণতা মূল বাংলা বানানের জন্য একটি নীরব হুমকি তৈরি করেছে। নতুন প্রজন্ম অনেক ক্ষেত্রেই প্রমিত বানানের চর্চা থেকে দূরে সরে যাচ্ছে। তাই ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মগুলোতে প্রমিত বানানের অ্যালগরিদম আরও উন্নত করা এবং সফটওয়্যারগুলোর ডিফল্ট ডিকশনারিতে বাংলা একাডেমির নিয়ম সংযুক্ত করা অত্যন্ত জরুরি।

সচরাচর জিজ্ঞাসিত প্রশ্ন (People Also Ask – PAA)

প্রশ্ন ১: কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের বানান বিধি কবে প্রবর্তিত হয় এবং এর প্রধান রূপকার কে ছিলেন?
উত্তর: ১৯৩৬ সালে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় প্রথম আনুষ্ঠানিকভাবে বাংলা বানানের নিয়ম প্রবর্তন করে। এর প্রধান রূপকার ছিলেন ভাষাতাত্ত্বিক সুনীতিকুমার চট্টোপাধ্যায় এবং এতে সার্বিক সমর্থন ও পরামর্শ দিয়েছিলেন বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর।
প্রশ্ন ২: বিদেশি শব্দে ‘ণ’ (মূর্ধন্য-ণ) এবং ‘ষ’ (মূর্ধন্য-ষ) ব্যবহার করা হয় না কেন?
উত্তর: ণত্ব বিধান ও ষত্ব বিধান হলো সম্পূর্ণ সংস্কৃত ব্যাকরণের নিয়ম, যা কেবল তৎসম বা সংস্কৃত থেকে সরাসরি আগত শব্দের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য। যেহেতু বিদেশি শব্দগুলো (যেমন- ইংরেজি, আরবি) সংস্কৃত নয়, তাই এগুলোতে সংস্কৃত ব্যাকরণের নিয়ম খাটে না। এ কারণে ‘স্টেশন’ (Station) বা ‘মডার্ন’ (Modern) বানানে ‘ষ’ বা ‘ণ’ হয় না।
প্রশ্ন ৩: ‘একাডেমী’ নাকি ‘একাডেমি’—কোন বানানটি শুদ্ধ এবং কেন?
উত্তর: শুদ্ধ বানানটি হলো ‘একাডেমি’ (হ্রস্ব ই-কার দিয়ে)। বাংলা একাডেমির প্রণীত প্রমিত বানানরীতি অনুযায়ী, সকল বিদেশি শব্দে কেবল হ্রস্ব ই-কার (ি) ব্যবহৃত হবে। ‘Academy’ একটি ইংরেজি শব্দ হওয়ায় এতে দীর্ঘ ঈ-কার (ী) ব্যবহারের কোনো সুযোগ নেই।

উপসংহার

বাংলা বানান সংস্কার কোনো স্থির বা সমাপ্ত প্রক্রিয়া নয়; এটি একটি চলমান ভাষাতাত্ত্বিক বিবর্তন। হ্যালহেডের যুগ থেকে শুরু করে বর্তমান বাংলা একাডেমি পর্যন্ত এই দীর্ঘ পথপরিক্রমায় বাংলা বানান ক্রমশ যৌক্তিক, সুশৃঙ্খল এবং সহজবোধ্য হয়েছে। তবে ভাষার মূল মালিক সাধারণ মানুষ। তাই প্রমিত বানানের নিয়মগুলো শুধু ব্যাকরণ বইয়ের পাতায় সীমাবদ্ধ না রেখে সর্বস্তরের শিক্ষাব্যবস্থা, গণমাধ্যম এবং ডিজিটাল মাধ্যমে এর সঠিক প্রয়োগ নিশ্চিত করতে হবে। তবেই বাংলা ভাষা তার নিজস্ব স্বকীয়তা ও শুদ্ধতা নিয়ে বিশ্বদরবারে দীর্ঘকাল সগৌরবে টিকে থাকবে।

 

 

বাংলা বর্ণমালা লেখার সঠিক নিয়ম, কৌশল, পদ্ধতি:

 

 

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।