কবিতার মূল তথ্য:
| বিষয়বিবরণ | তথ্য |
| কবিতার নাম | স্থবির যৌবন |
| কবির নাম | জীবনানন্দ দাশ |
| মূল কাব্যগ্রন্থ | মহাপৃথিবী |
| প্রকাশের বছর | ১৯৪৪ খ্রিষ্টাব্দ |
| কবিতার ধরন | পরাবাস্তব ও আধুনিক দার্শনিক কবিতা |
কবি পরিচিতি ও প্রেক্ষাপট:
সম্পূর্ণ কবিতা:
তারপর একদিন উজ্জ্বল মৃত্যৃর দূত এসে
কহিবেঃতোমারে চাই- তোমারেই,নারী;
এইসব সোনা রূপা মসলিন যুবাদের ছাড়ি
চ’লে যেতে হবে দূর আবিষ্কারে ভেসে।
বলিলাম;শুনিল সেঃ’তুমি তবু মৃত্যুর দূত নও-তুমি-‘
‘নগর-বন্দর ঢের খুঁজিয়াছি আমি;
তারপর তোমার এই জানালায় থামি
ধোঁয়া সব;-তুমি যেন মরীচিকা-আমি মরুভূমি-‘
শীতের বাতাস নাকে চলে গেলো জানালার দিকে
পড়িল আধেক শাল বুক থেকে খসে
সুন্দর জন্তুর মতো তার দেহকোষে
রক্ত শুধু দেহ শুধু শুধু হরিণীকে
বাঘের বিক্ষোভ বুকে নিয়ে নদীর কিনারে-নিম্নে-রাতে?
তবে তুমি ফিরে যাও ধোঁয়ায় আবার;
উজ্জ্বল মৃত্যুর দূত বিবর্ণ এবার-
বরং নারীকে ছেড়ে কঙ্কালের হাতে
তোমারে তুলিয়া লবে কুয়াশা-ঘোড়ায়।
তুমি এই পৃথিবীর অনাদি স্থবির;-
সোনালি মাছের মতো তবু করে ভিড়
নীল শৈবালের নিচে জলের মায়ায়
প্রেম-স্বপ্ন-পৃথিবীর স্বপ্ন প্রেম তোমার হৃদয়ে।
হে স্থবির, কী চাও বলো তো-
শাদা ডানা কোনো এক সারসের মতো?
হয়তো সে মাংস নয়-এই নারী; তবু মৃত্যু পড়ে নাই আজ তার মোহে।
তাহার ধূসর ঘোড়া চরিতেছে নদীর কিনারে
কোনো এক বিকেলের জাফরান দেশে।
কোকিল কুকুর জ্যেৎস্না ধুলো হয়ে গেছে কত ভেসে?
মরণের হাত ধরে স্বপ্ন ছাড়া কে বাঁচিতে পারে?
কবিতাটির রোমান রূপ (Romanized Version)
কবিতার মূল ভাব ও বিশ্লেষণ:
- মৃত্যুর আহ্বান ও যৌবনের নশ্বরতা:“তারপর একদিন উজ্জ্বল মৃত্যৃর দূত এসে / কহিবেঃতোমারে চাই- তোমারেই,নারী;”— মৃত্যুর দূত এসে নারীকে সমস্ত পার্থিব মোহ (সোনা, রুপা, মসলিন) ছেড়ে অজানার উদ্দেশে পাড়ি দেওয়ার আহ্বান জানায়। এটি যৌবন ও পার্থিব সম্পদের চূড়ান্ত নশ্বরতার ইঙ্গিত দেয়।
- দেহজ প্রেম বনাম স্বপ্ন:“সোনালি মাছের মতো তবু করে ভিড় / নীল শৈবালের নিচে জলের মায়ায় / প্রেম-স্বপ্ন-পৃথিবীর স্বপ্ন প্রেম তোমার হৃদয়ে।”— কবিতায় একদিকে যেমন মাংসল দেহের নশ্বরতাকে তুলে ধরা হয়েছে, তেমনি এর বিপরীতে দেখানো হয়েছে মানুষের ভেতরের স্বপ্নকে। নীল শৈবালের নিচে সোনালি মাছের মতো মানুষের হৃদয়ে যে প্রেম ও স্বপ্নের বাস, তা এই স্থবির পৃথিবীতেও এক মায়াবী আবেশ তৈরি করে।
- মৃত্যু ও স্বপ্নের শাশ্বত দ্বন্দ্ব:“মরণের হাত ধরে স্বপ্ন ছাড়া কে বাঁচিতে পারে?”— কবিতার এই সমাপ্তি লাইনটি এক অমোঘ দার্শনিক সত্য। মৃত্যুর অমোঘ উপস্থিতিতেও মানুষের ‘স্বপ্ন’ই তার একমাত্র আশ্রয়। স্থবির যৌবন ও মৃত্যুর অনিবার্যতার মাঝে স্বপ্নই মানুষকে অনন্তকাল বাঁচিয়ে রাখার শক্তি জোগায়।