বাংলা গুরুকুল, GOLN

জীবনানন্দ দাশের ‘মহাপৃথিবী’ কাব্যগ্রন্থের একটি গভীর পরাবাস্তব ও দার্শনিক কবিতা হলো ‘স্থবির যৌবন’। এই কবিতায় প্রেম, বার্ধক্য, মৃত্যু এবং স্বপ্নের এক অদ্ভুত মেলবন্ধন ঘটেছে। নশ্বর দেহ এবং অবিনশ্বর স্বপ্নের মাঝে মানুষের অস্তিত্বের সংকট ও মহাকালের কাছে মানুষের অসহায়ত্ব এখানে অত্যন্ত নিপুণভাবে তুলে ধরা হয়েছে।

কবিতার মূল তথ্য:

বিষয়বিবরণতথ্য
কবিতার নামস্থবির যৌবন
কবির নামজীবনানন্দ দাশ
মূল কাব্যগ্রন্থমহাপৃথিবী
প্রকাশের বছর১৯৪৪ খ্রিষ্টাব্দ
কবিতার ধরনপরাবাস্তব ও আধুনিক দার্শনিক কবিতা

কবি পরিচিতি ও প্রেক্ষাপট:

১৯৪৪ সালে প্রকাশিত ‘মহাপৃথিবী’ কাব্যগ্রন্থে জীবনানন্দ দাশের কবিতার সুর আরও অন্তর্মুখী, জটিল ও দার্শনিক হয়ে ওঠে। ‘স্থবির যৌবন’ কবিতায় তিনি নারী, প্রেম এবং মৃত্যুকে এক ভিন্ন ও রহস্যময় দৃষ্টিকোণ থেকে দেখেছেন। যৌবনের স্থবিরতা এবং মৃত্যুর দূতের উপস্থিতির মাঝেও মানুষের অন্তরের প্রেম ও স্বপ্ন কীভাবে বেঁচে থাকতে চায়, তারই এক পরাবাস্তব চিত্র কবি এখানে এঁকেছেন।

সম্পূর্ণ কবিতা:

তারপর একদিন উজ্জ্বল মৃত্যৃর দূত এসে
কহিবেঃতোমারে চাই- তোমারেই,নারী;
এইসব সোনা রূপা মসলিন যুবাদের ছাড়ি
চ’লে যেতে হবে দূর আবিষ্কারে ভেসে।

বলিলাম;শুনিল সেঃ’তুমি তবু মৃত্যুর দূত নও-তুমি-‘
‘নগর-বন্দর ঢের খুঁজিয়াছি আমি;
তারপর তোমার এই জানালায় থামি
ধোঁয়া সব;-তুমি যেন মরীচিকা-আমি মরুভূমি-‘

শীতের বাতাস নাকে চলে গেলো জানালার দিকে
পড়িল আধেক শাল বুক থেকে খসে
সুন্দর জন্তুর মতো তার দেহকোষে
রক্ত শুধু দেহ শুধু শুধু হরিণীকে

বাঘের বিক্ষোভ বুকে নিয়ে নদীর কিনারে-নিম্নে-রাতে?
তবে তুমি ফিরে যাও ধোঁয়ায় আবার;
উজ্জ্বল মৃত্যুর দূত বিবর্ণ এবার-
বরং নারীকে ছেড়ে কঙ্কালের হাতে
তোমারে তুলিয়া লবে কুয়াশা-ঘোড়ায়।
তুমি এই পৃথিবীর অনাদি স্থবির;-
সোনালি মাছের মতো তবু করে ভিড়
নীল শৈবালের নিচে জলের মায়ায়

প্রেম-স্বপ্ন-পৃথিবীর স্বপ্ন প্রেম তোমার হৃদয়ে।
হে স্থবির, কী চাও বলো তো-
শাদা ডানা কোনো এক সারসের মতো?
হয়তো সে মাংস নয়-এই নারী; তবু মৃত্যু পড়ে নাই আজ তার মোহে।

তাহার ধূসর ঘোড়া চরিতেছে নদীর কিনারে
কোনো এক বিকেলের জাফরান দেশে।
কোকিল কুকুর জ্যেৎস্না ধুলো হয়ে গেছে কত ভেসে?
মরণের হাত ধরে স্বপ্ন ছাড়া কে বাঁচিতে পারে?

কবিতাটির রোমান রূপ (Romanized Version)

Tarpor ekdin ujjwal mrityur dut eshe
Kohibe: tomare chai- tomarei, nari;
Eishob shona rupa moslin jubader chari
Ch’le jete hobe dur abishkare bheshe.
Bolilam; shunilo she: ‘Tumi tobu mrityur dut nao- tumi-‘
‘Nogor-bondor dher khujiyachi ami;
Tarpor tomar ei janalay thami
Dhowa shob;- tumi jeno morichika- ami morubhumi-‘
Shiter batash nake chole gelo janalar dike
Porilo adhek shal buk theke khoshe
Shundor jontur moto tar dehokoshe
Rokto shudhu deho shudhu shudhu horinike
Bagher bikhobh buke niye nodir kinare- nimne- rate?
Tobe tumi phire jao dhoway abar;
Ujjwal mrityur dut biborno ebar-
Borong narike chere kongkaler hate
Tomare tuliya lobe kuasha-ghoray.
Tumi ei prithibir onadi sthobir;-
Shonali macher moto tobu kore bhir
Nil shoibaler niche joler mayay
Prem-shopno-prithibir shopno prem tomar hridoye.
He sthobir, ki chao bolo to-
Shada dana kono ek sharosher moto?
Hoyto she mangsho noy- ei nari; tobu mrityu pore nai aj tar mohe.
Tahar dhushor ghora choriteche nodir kinare
Kono ek bikeler jafran deshe.
Kokil kukur jyotsna dhulo hoye geche koto bheshe?
Moroner hat dhore shopno chara ke bachite pare?

কবিতার মূল ভাব ও বিশ্লেষণ:

  • মৃত্যুর আহ্বান ও যৌবনের নশ্বরতা:
    “তারপর একদিন উজ্জ্বল মৃত্যৃর দূত এসে / কহিবেঃতোমারে চাই- তোমারেই,নারী;”
    — মৃত্যুর দূত এসে নারীকে সমস্ত পার্থিব মোহ (সোনা, রুপা, মসলিন) ছেড়ে অজানার উদ্দেশে পাড়ি দেওয়ার আহ্বান জানায়। এটি যৌবন ও পার্থিব সম্পদের চূড়ান্ত নশ্বরতার ইঙ্গিত দেয়।
  • দেহজ প্রেম বনাম স্বপ্ন:
    “সোনালি মাছের মতো তবু করে ভিড় / নীল শৈবালের নিচে জলের মায়ায় / প্রেম-স্বপ্ন-পৃথিবীর স্বপ্ন প্রেম তোমার হৃদয়ে।”
    — কবিতায় একদিকে যেমন মাংসল দেহের নশ্বরতাকে তুলে ধরা হয়েছে, তেমনি এর বিপরীতে দেখানো হয়েছে মানুষের ভেতরের স্বপ্নকে। নীল শৈবালের নিচে সোনালি মাছের মতো মানুষের হৃদয়ে যে প্রেম ও স্বপ্নের বাস, তা এই স্থবির পৃথিবীতেও এক মায়াবী আবেশ তৈরি করে।
  • মৃত্যু ও স্বপ্নের শাশ্বত দ্বন্দ্ব:
    “মরণের হাত ধরে স্বপ্ন ছাড়া কে বাঁচিতে পারে?”
    — কবিতার এই সমাপ্তি লাইনটি এক অমোঘ দার্শনিক সত্য। মৃত্যুর অমোঘ উপস্থিতিতেও মানুষের ‘স্বপ্ন’ই তার একমাত্র আশ্রয়। স্থবির যৌবন ও মৃত্যুর অনিবার্যতার মাঝে স্বপ্নই মানুষকে অনন্তকাল বাঁচিয়ে রাখার শক্তি জোগায়।

উৎস:

কবিতাটির মূল পাঠ ও প্রাসঙ্গিক তথ্যাবলি জীবনানন্দ দাশের প্রামাণ্য কাব্যসংকলন ‘মহাপৃথিবী’ (১৯৪৪) এবং আপনার প্রদত্ত তথ্যসূত্র থেকে সতর্কতার সাথে সংগৃহীত ও বিন্যস্ত করা হয়েছে।

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।