বাংলা সাহিত্যে ননসেন্স (Nonsense) ছড়ার প্রবর্তক এবং অবিসংবাদিত শ্রেষ্ঠ রূপকার সুকুমার রায়ের এক কালজয়ী সৃষ্টি হলো ‘শব্দকল্পদ্রুম’। তাঁর অমর কাব্যগ্রন্থ ‘আবল তাবোল’-এর এই কবিতায় প্রকৃতির সম্পূর্ণ নিস্তব্ধ ঘটনাগুলোকে (যেমন—ফুল ফোটা, হিম পড়া বা চাঁদ ডোবা) বিকট ও হাস্যরসাত্মক সব ধ্বন্যাত্মক শব্দের মাধ্যমে প্রকাশ করে এক অদ্ভুত ও মজাদার কল্পনার জগৎ তৈরি করা হয়েছে।
| বিষয় | বিবরণ |
| কবিতার নাম | শব্দকল্পদ্রুম |
| কবির নাম | সুকুমার রায় |
| মূল কাব্যগ্রন্থ | আবল তাবোল |
| প্রকাশের বছর | ১৯২৩ খ্রিষ্টাব্দ (১৩৩০ বঙ্গাব্দ) |
| কবিতার ধরন | ননসেন্স ছড়া ও শিশুতোষ হাস্যরসাত্মক কবিতা (Nonsense Rhyme / Humorous Poem) |
১৯২৩ সালে প্রকাশিত ‘আবল তাবোল’ বাংলা শিশুসাহিত্যের এক অমূল্য রত্ন। ‘শব্দকল্পদ্রুম’ শব্দটির আভিধানিক অর্থ হলো কল্পনার এমন এক গাছ যা থেকে শব্দ ঝরে পড়ে। কিন্তু সুকুমার রায় এই কবিতায় সম্পূর্ণ ভিন্ন এক অর্থ তৈরি করেছেন। আমাদের চারপাশে যেসব ঘটনা সম্পূর্ণ নিঃশব্দে ঘটে, কবি তার জন্য অবাস্তব ও বিকট সব ধ্বনি কল্পনা করেছেন। এই অসম্ভব কল্পনা এবং শব্দের অসাধারণ কারুকাজই সুকুমার রায়ের ননসেন্স ছড়ার মূল বৈশিষ্ট্য।
শব্দকল্পদ্রুম – সম্পূর্ণ কবিতা
ঠাস্ ঠাস্ দ্রুম দ্রাম,শুনে লাগে খটকা–
ফুল ফোটে? তাই বল! আমি ভাবি পট্কা!
শাঁই শাঁই পন্ পন্, ভয়ে কান বন্ধ–
ওই বুঝি ছুটে যায় সে-ফুলের গন্ধ?
হুড়মুড় ধুপধাপ–ওকি শুনি ভাইরে!
দেখ্ছনা হিম পড়ে– যেও নাকো বাইরে।
চুপ চুপ ঐ শোন্! ঝুপ ঝাপ্ ঝপা-স!
চাঁদ বুঝি ডুবে গেল? গব্ গব্ গবা-স!
খ্যাঁশ্ খ্যাঁশ্ ঘ্যাঁচ্ ঘ্যাঁচ্ , রাত কাটে ঐরে!
দুড়দাড় চুরমার–ঘুম ভাঙে কই রে!
ঘর্ঘর ভন্ ভন্ ঘোরে কত চিন্তা!
কত মন নাচ শোন্–ধেই ধেই ধিন্তা!
ঠুংঠাং ঢংঢং, কত ব্যথা বাজেরে–
ফট্ ফট্ বুক ফাটে তাই মাঝে মাঝে রে!
হৈ হৈ মার্ মার্ “বাপ্ বাপ্” চিৎকার–
মালকোঁচা মারে বুঝি? সরে পড়্ এইবার।
Shobdokolpodrum – Shompurno Kobita
Thash thash drum dram, shune lage khotka–\
Phul phote? Tai bol! Ami bhabi potka!\
Shai shai pon pon, bhoye kan bondho–\
Oi bujhi chhute jay shei-phuler gondho?\
Hurmur dhupdhap–oki shuni bhaire!\
Dekhchho na him pore– jeyo nako baire।\
Chup chup oi shono! Jhop jhap jhopash!\
Chand bujhi dube gelo? Gob gob gobash!\
Khyansh khyansh ghyanj ghyanj, rat kate oire!\
Durdar churmar–ghum bhange koi re!\
Ghorghor bhan bhan ghore koto chinta!\
Koto mon nach shon–dhei dhei dhinta!\
Thungthang dhongdhong, koto byatha bajere–\
Phot phot buk phate tai majhe majhe re!\
Hoi hoi mar mar “bap bap” chitkar–\
Malkoncha mare bujhi? Sore por eibar।
কবিতার মূল ভাব ও বিশ্লেষণ
নিঃশব্দ ঘটনার সশব্দ রূপায়ণ: “ঠাস্ ঠাস্ দ্রুম দ্রাম,শুনে লাগে খটকা– / ফুল ফোটে? তাই বল! আমি ভাবি পট্কা!” — ফুল ফোটার মতো পৃথিবীর অন্যতম একটি নিস্তব্ধ ঘটনাকে কবি পটকা ফাটার বিকট শব্দের সাথে তুলনা করেছেন। একইভাবে ফুলের গন্ধ ছুটে যাওয়ার শব্দ “শাঁই শাঁই”, হিম বা শিশির পড়ার শব্দ “হুড়মুড় ধুপধাপ” এবং চাঁদ ডোবার শব্দকে “গব্ গব্ গবা-স” হিসেবে কল্পনা করেছেন। এই সম্পূর্ণ অবাস্তব ও উদ্ভট কল্পনাই কবিতাটির প্রধান আকর্ষণ।
ধ্বন্যাত্মক শব্দের নিপুণ ব্যবহার: সুকুমার রায় শব্দের জাদুকর ছিলেন। কবিতায় “খ্যাঁশ্ খ্যাঁশ্”, “ঘ্যাঁচ্ ঘ্যাঁচ্”, “ঠুংঠাং” বা “ফট্ ফট্”-এর মতো ধ্বন্যাত্মক (Onomatopoeic) শব্দগুলো এমনভাবে ব্যবহার করা হয়েছে, যা পড়ার সময় পাঠকর মনে এক ধরনের ধ্বনিগত উন্মাদনা ও হাস্যরসের সৃষ্টি করে। রাত কাটার বা ঘুম ভাঙার মতো বিমূর্ত ঘটনাগুলোকেও তিনি শব্দের মাধ্যমে মূর্ত করে তুলেছেন।
নির্মল হাস্যরস ও ননসেন্স মেজাজ: “হৈ হৈ মার্ মার্ “বাপ্ বাপ্” চিৎকার– / মালকোঁচা মারে বুঝি? সরে পড়্ এইবার।” — কোনো যৌক্তিক অর্থ না খুঁজে কেবল ধ্বনির খেলায় মেতে ওঠা এবং সবশেষে এক অদ্ভুত হট্টগোলের ইঙ্গিত দিয়ে দ্রুত সরে পড়ার পরামর্শ—এসবই সুকুমার রায়ের ননসেন্স ছড়ার সেই চিরচেনা রূপ, যা যুক্তিহীনতার মাঝেই চরম আনন্দ প্রদান করে।
উৎস কবিতাটির মূল পাঠ ও বানানরীতি সুকুমার রায়ের প্রামাণ্য রচনাবলী এবং ‘আবল তাবোল’ (১৯২৩) কাব্যগ্রন্থ থেকে সতর্কতার সাথে সংগৃহীত ও বিন্যস্ত।