বাংলা গুরুকুল, GOLN

রবীন্দ্র জন্মজয়ন্তী উপলক্ষে একটি ভাষণ এর তৈরি করে দেয়া হল। উপস্থাপিত ভাষণটি একটি আদর্শ কাঠামো হিসেবে তৈরি করা হয়েছে। ভাষণ কোনো মুখস্থ পাঠ নয়, বরং এটি বক্তার ব্যক্তিত্ব এবং উপস্থিত শ্রোতাদের সাথে একাত্ম হওয়ার একটি মাধ্যম। তোমরা এই খসড়াটি থেকে মূল পয়েন্টগুলো সংগ্রহ করে নিজের বাচনভঙ্গি ও আবেগ মিশিয়ে একটি মৌলিক ভাষণ তৈরির চেষ্টা করবে। মনে রাখবে, মঞ্চে সাবলীলতা ও স্পষ্ট উচ্চারণই হলো সফল ভাষণের চাবিকাঠি।

রবীন্দ্র জন্মজয়ন্তী উপলক্ষে একটি ভাষণ

BanglaGOLN.com Logo 252x68 px White রবীন্দ্র জন্মজয়ন্তী উপলক্ষে একটি ভাষণ | ভাষণ | ভাষা ও শিক্ষা

 

মাননীয় সভাপতি, প্রধান অতিথি, আমন্ত্রিত সুধীবৃন্দ এবং আমার সহপাঠী ও প্রিয় রবীন্দ্র-অনুরাগীগণ,

সবাইকে জানাই পঁচিশে বৈশাখের আন্তরিক শুভেচ্ছা ও ভালোবাসা।

“মুছে যাক গ্লানি, ঘুচে যাক জরা,

অগ্নিস্নানে শুচি হোক ধরা।”

কবির নিজের গানের এই মহতী বাণীর মধ্য দিয়েই আজ নতুন করে জেগে ওঠার দিন। আজ পঁচিশে বৈশাখ। বাঙালির হৃদস্পন্দন, বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের শুভ জন্মদিন। ১২৬৮ বঙ্গাব্দের এই মাহেন্দ্রক্ষণে কলকাতার জোড়াসাঁকোর ঠাকুরবাড়িতে যে আলোর শিখা জ্বলে উঠেছিল, আজ দেড়শ বছরেরও বেশি সময় পর সেই আলোর দীপ্তি কেবল বাংলা নয়, সমগ্র বিশ্বের জ্ঞান ও সংস্কৃতির আকাশকে উদ্ভাসিত করে রেখেছে।

উপস্থিত সুধীবৃন্দ,

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর বাঙালির কাছে কেবল একজন লেখক বা কবি নন; তিনি আমাদের অস্তিত্বের ধ্রুবতারা। আমাদের আনন্দ-বেদনা, প্রেম-বিরহ, উৎসব-পার্বণ কিংবা সংকটে-সংগ্রামে—এমন কোনো মুহূর্ত নেই যেখানে রবীন্দ্রনাথাকে খুঁজে পাওয়া যায় না। তিনি বাংলা ভাষাকে দিয়েছেন আভিজাত্য এবং বিশ্বমঞ্চে এনে দিয়েছেন পরম গৌরব। ১৯১৩ সালে ‘গীতাঞ্জলি’ কাব্যগ্রন্থের জন্য সাহিত্যে নোবেল পুরস্কার অর্জন করে তিনি প্রমাণ করেছিলেন যে, প্রান্তিক কোনো অঞ্চলের ভাষা ও ভাবও হতে পারে বিশ্বজনীন ও শাশ্বত।

সুধিজন,

রবীন্দ্র-প্রতিভাকে কোনো নির্দিষ্ট সংজ্ঞায় আবদ্ধ করা অসম্ভব। তিনি একাধারে কবি, ঔপন্যাসিক, ছোটগল্পকার, প্রাবন্ধিক, নাট্যকার ও চিত্রশিল্পী। তাঁর গান বা রবীন্দ্রসংগীত বাঙালির আধ্যাত্মিক ও মানসিক জীবনের অক্সিজেন। কিন্তু তাঁর মহত্ত্ব কেবল সাহিত্য সৃষ্টির মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল না। তিনি ছিলেন একজন দূরদর্শী শিক্ষাবিদ ও সমাজ সংস্কারক। ‘শান্তিনিকেতন’ ও ‘বিশ্বভারতী’র মধ্য দিয়ে তিনি শিক্ষার যে উদার ও প্রকৃতির সাথে মিশে থাকা রূপটি আমাদের দেখিয়েছেন, তা আজও বিশ্বের কাছে এক বিস্ময়।

তিনি আমাদের শিখিয়েছেন দেশপ্রেমের প্রকৃত অর্থ। তিনি যেমন নিজের মাতৃভূমিকে ভালোবেসেছেন, তেমনি সংকীর্ণ জাতীয়তাবাদের উর্ধ্বে উঠে বিশ্বমানবতার জয়গান গেয়েছেন। তাঁর কাছে মানুষ বড় ছিল ধর্মের চেয়ে, বর্ণের চেয়ে কিংবা ভূগোলের চেয়ে। তাই তো তিনি বলতে পেরেছেন— “সব ঠাঁই মোর ঘর আছে, আমি সেই ঘর মরি খুঁজি।”

প্রিয় মণ্ডলী,

আজকের অস্থির সময়ে, যখন চারদিকে অসহিষ্ণুতা আর ঘৃণার বাতাবরণ, তখন রবীন্দ্রনাথের আদর্শ ও দর্শন আরও বেশি প্রাসঙ্গিক হয়ে উঠেছে। তাঁর ‘সভ্যতার সংকট’ প্রবন্ধটি আজও আমাদের বিবেককে নাড়া দেয়। রবীন্দ্রনাথকে কেবল বিশেষ দিনগুলোতে স্মরণ করাই যথেষ্ট নয়, বরং তাঁর সৃষ্টির ভেতর দিয়ে আমাদের নৈতিকতা ও মানবিক বোধকে জাগ্রত করা প্রয়োজন। তাঁর পঁচিশে বৈশাখ আমাদের চেতনাকে বারবার ধুয়ে-মুছে পরিষ্কার করে দেয়, আমাদের নতুন করে মানুষ হওয়ার শপথ করায়।

তবে সুধীবৃন্দ,

রবীন্দ্রনাথের এই বিশাল প্রজ্ঞা ও জীবনদর্শন কেবল তখনই আমাদের জীবনে সার্থক হবে, যদি আমরা তাঁকে নিয়মিত পাঠ করি এবং তাঁর সৃষ্টিকে হৃদয়ে ধারণ করি। আসুন, আজ এই পঁচিশে বৈশাখের পুণ্যলগ্নে আমরা সকলে মিলে একটি দৃঢ় অঙ্গীকার করি—রবীন্দ্রনাথকে আমরা কেবল বিশেষ দিবসের আনুষ্ঠানিকতায় বা দিবস যাপনের সীমাবদ্ধ গণ্ডিতে আটকে রাখব না। বরং আমাদের প্রতিদিনের প্রাত্যহিক জীবনে, আমাদের কর্মে ও মননে তাঁর সাহিত্যকে পাথেয় করব, তাঁর গানের সুর দিয়ে নিজের অন্তরকে পরিশুদ্ধ করব। তাঁর দিয়ে যাওয়া জীবনবোধ ও দূরদৃষ্টিসম্পন্ন প্রজ্ঞা আমাদের দৈনন্দিন সংকটে আলোকবর্তিকা হিসেবে কাজ করুক। আমরা যদি প্রতিটি দিন রবীন্দ্র-চেতনা নিয়ে যাপন করতে পারি, তবেই আমাদের জীবন হবে আরও উন্নত, মার্জিত এবং প্রকৃত অর্থেই মানবিক।

উপসংহার

পরিশেষে বলতে চাই, রবীন্দ্রনাথ বাঙালির এমন এক সম্পদ যা কখনো পুরনো হয় না। যতদিন পৃথিবীতে বাংলা ভাষা থাকবে, যতদিন মানুষের হৃদয়ে শিল্পের কদর থাকবে, ততদিন রবীন্দ্রনাথ থাকবেন আমাদের প্রতিটি নিশ্বাসে। পঁচিশে বৈশাখ আমাদের হৃদয়ে বারবার ফিরে আসুক নতুন প্রাণের গান নিয়ে।

রবীন্দ্রনাথের ভাষায় বলি—

“মরিতে চাহি না আমি সুন্দর ভুবনে,

মানবের মাঝে আমি বাঁচিবারে চাই।”

তিনি বেঁচে আছেন, আর আমাদের মাঝে বেঁচে থাকবেন অনন্তকাল। সবাইকে ধৈর্য ধরে আমার বক্তব্য শোনার জন্য আন্তরিক ধন্যবাদ।

জয়তু রবীন্দ্রনাথ।

ধন্যবাদ সবাইকে।

 

আরও দেখুন:

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।