বাংলা গুরুকুল, GOLN

রূপসী বাংলার কবি জীবনানন্দ দাশের ‘মহাপৃথিবী’ কাব্যগ্রন্থের একটি অসাধারণ পরাবাস্তব ও বিষাদমাখা কবিতা হলো ‘স্বপ্ন’। এই কবিতায় কবির চিরচেনা বিষণ্ণতা, হারানো প্রেমের স্মৃতি এবং সময়ের কাছে সবকিছুর বিলীন হয়ে যাওয়ার এক গভীর দার্শনিক বোধ ফুটে উঠেছে। পৃথিবীর সমস্ত আলো ও কোলাহল যখন চিরতরে নিভে যাবে, তখনও অনন্ত স্বপ্নের মাঝে ভালোবাসার মুখের বেঁচে থাকার যে শাশ্বত আকাঙ্ক্ষা, তা এই কবিতাকে এক অনন্য মাত্রা দিয়েছে।

কবিতার মূল তথ্য:

বিষয়বিবরণতথ্য
কবিতার নামস্বপ্ন
কবির নামজীবনানন্দ দাশ
মূল কাব্যগ্রন্থমহাপৃথিবী
প্রকাশের বছর১৯৪৪ খ্রিষ্টাব্দ
কবিতার ধরনপরাবাস্তববাদী ও রোমান্টিক কবিতা (Surrealist and Romantic Poem)

কবি পরিচিতি ও প্রেক্ষাপট:

জীবনানন্দ দাশের চতুর্থ কাব্যগ্রন্থ ‘মহাপৃথিবী’ ১৯৪৪ সালে সত্যপ্রসন্ন ঘোষের প্রকাশনায় আত্মপ্রকাশ করে। এই সময়কালটি ছিল দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের ডামাডোল এবং মানবিক সংকটের এক চরম পর্যায়। তবে ‘স্বপ্ন’ কবিতায় কবি বাহ্যিক পৃথিবীর কোলাহল থেকে দূরে সরে গিয়ে নিজের অবচেতন মনের এক নিভৃত ও রহস্যময় জগতে প্রবেশ করেছেন। ধূসর পান্ডুলিপি, নিভে যাওয়া প্রদীপ এবং কুয়াশার আবহে কবি তাঁর এক হারানো প্রেমিকার স্মৃতি রোমন্থন করেছেন, যা বাস্তব পৃথিবীতে ধূসর হয়ে গেলেও স্বপ্নের জগতে চিরকাল অম্লান থাকবে বলে তিনি বিশ্বাস করেন।

সম্পূর্ণ কবিতা:

পান্ডুলিপি কাছে রেখে ধূসর দীপের কাছে আমি
নিস্তব্ধ ছিলাম বসে;
শিশির পড়িতেছিল ধীরে ধীরে খসে;
নিমের শাখার থেকে একাকীতম কে পাখি নামি
উড়ে গেল কুয়াশায়-কুয়াশায় থেকে দূর কুয়াশায় আরো।
তাহারই পাখার হাওয়া প্রদীপ নিভায়ে গেল বুঝি?
অন্ধকার হাতড়ায়ে ধীরে ধীরে দেশলাই খুঁজি;
যখন জ্বালিব আলো কার মুখ দেখা যাবে বলিতে কি পারো?
কার মুখ?-আমলকী শাখার পিছনে
শিঙের মতন বাঁকা নীল চাঁদ একদিন দেখেছিল তাহা;
এ ধূসর পান্ডুলিপি একদিন দেখেছিল, আহা,
সে মুখ ধূসরতম আজ এই পৃথিবীর মনে।
তবু এই পৃথিবীর সব আলো একদিন নিভে গেলে পরে,
পৃথিবীর সব গল্প একদিন ফুরাবে যখন,
মানুষ রবে না আর, রবে শুধু মানুষের স্বপণ তখন:
সেই মুখ আর আমি র’ব সেই স্বপনের ভিতরে।

সম্পূর্ণ কবিতার Romanized Version:

Pandulipi kachhe rekhe dhushor diper kachhe ami
Nistobdho chilam boshe;
Shishir poritechhilo dhire dhire khoshe;
Nimer shakhar theke ekakitomo ke pakhi nami
Ure gelo kuashay-kuashay theke dur kuashay aro.
Tahar-i pakhar hawa prodip nibhaye gelo bujhi?
Ondhokar hatoraye dhire dhire deshlai khunji;
Jokhon jwalibo alo kar mukh dekha jabe bolite ki paro?
Kar mukh?-amloki shakhar pichhone
Shinger moton baka nil chand ekdin dekhechhilo taha;
E dhushor pandulipi ekdin dekhechhilo, aha,
She mukh dhushortomo aj ei prithibir mone.
Tobu ei prithibir shob alo ekdin nibhe gele pore,
Prithibir shob golpo ekdin phurabe jokhon,
Manush robe na ar, robe shudhu manusher swopon tokhon:
Shei mukh ar ami ro’bo shei swoponer bhitore.

কবিতার মূল ভাব ও বিশ্লেষণ:

  • রহস্যময়তা ও পরাবাস্তব আবহ:
    “নিমের শাখার থেকে একাকীতম কে পাখি নামি / উড়ে গেল কুয়াশায়-কুয়াশায় থেকে দূর কুয়াশায় আরো। / তাহারই পাখার হাওয়া প্রদীপ নিভায়ে গেল বুঝি?”
    — কবিতার শুরুতে এক গা ছমছমে, নিস্তব্ধ রাতের চিত্র আঁকা হয়েছে। একটি নাম-না-জানা পাখির ডানার বাতাসে প্রদীপ নিভে যাওয়ার এই বর্ণনা এক গভীর পরাবাস্তব (surreal) এবং রহস্যময় আবেশ তৈরি করে, যা পাঠককে অবচেতনের জগতে নিয়ে যায়।
  • স্মৃতির ধূসরতা ও বিস্মৃতি:
    “এ ধূসর পান্ডুলিপি একদিন দেখেছিল, আহা, / সে মুখ ধূসরতম আজ এই পৃথিবীর মনে।”
    — কবি তাঁর সেই হারানো ভালোবাসার মুখের কথা স্মরণ করছেন। সময়ের নির্মম স্রোতে সেই মুখ আজ পৃথিবীর বুক থেকে মুছে গেছে, মানুষের স্মৃতিতে তা আজ ‘ধূসরতম’। কেবল কবির পান্ডুলিপি আর প্রকৃতির কিছু উপাদান সেই রূপের সাক্ষী ছিল।
  • মহাকাল জয়ী প্রেমের স্বপ্ন:
    “পৃথিবীর সব গল্প একদিন ফুরাবে যখন, / মানুষ রবে না আর, রবে শুধু মানুষের স্বপণ তখন: / সেই মুখ আর আমি র’ব সেই স্বপনের ভিতরে।”
    — কবিতার এই সমাপ্তি অত্যন্ত দর্শনাশ্রয়ী ও রোমান্টিক। পৃথিবীর সবকিছু ধ্বংস হয়ে গেলেও, মানবজাতির সমস্ত কোলাহল থেমে গেলেও, মানুষের ‘স্বপ্ন’ থেকে যাবে। আর সেই অনন্ত স্বপ্নের জগতেই কবি ও তাঁর সেই প্রিয়তমার মুখ চিরকাল একসাথে বেঁচে থাকবে।

উৎস:

কবিতাটির মূল পাঠ ও প্রাসঙ্গিক তথ্যাবলি জীবনানন্দ দাশের প্রামাণ্য কাব্যসংকলন ‘মহাপৃথিবী’ (১৯৪৪) এবং আপনার প্রদত্ত তথ্যসূত্র থেকে সতর্কতার সাথে সংগৃহীত ও বিন্যস্ত করা হয়েছে।

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।