বাংলা গুরুকুল, GOLN

পিতা মাতার প্রতি কর্তব্য রচনা, পিতা মাতার প্রতি কর্তব্য [ Essay on Duty to parents ] অথবা, মাতা পিতার অবদান  – নিয়ে একটি প্রতিবেদন রচনার নমুনা দেয়া হল।

পিতা মাতার প্রতি কর্তব্য রচনা:

পিতা-মাতার প্রতি সন্তানের কর্তব্য: পারিবারিক ও সামাজিক দায়বদ্ধতা

মানবজীবনের সবচেয়ে পবিত্র, নিঃস্বার্থ এবং চিরন্তন সম্পর্ক হলো পিতা-মাতা ও সন্তানের সম্পর্ক। একজন শিশুর পৃথিবীতে আগমন থেকে শুরু করে তাকে একজন যোগ্য মানুষ হিসেবে গড়ে তোলার পেছনে পিতা-মাতার যে আত্মত্যাগ ও শ্রম থাকে, পৃথিবীর কোনো কিছুর বিনিময়েই তার ঋণ শোধ করা সম্ভব নয়। আধুনিক সমাজে যখন পারিবারিক বন্ধন শিথিল হতে শুরু করেছে এবং আত্মকেন্দ্রিকতার বিস্তার ঘটছে, তখন পিতা-মাতার প্রতি সন্তানের কর্তব্য ও দায়িত্ববোধ নিয়ে আলোচনা করা অত্যন্ত প্রাসঙ্গিক ও জরুরি।
পিতা-মাতার প্রতি দায়িত্ব পালন কেবল একটি নৈতিক বা পারিবারিক বিষয় নয়; এটি একটি সুস্থ, মানবিক ও মূল্যবোধসম্পন্ন সমাজ গঠনের অন্যতম প্রধান শর্ত।

সন্তানের জীবনে পিতা-মাতার অবদান ও আত্মত্যাগ

একজন মানুষের অস্তিত্বের প্রথম মুহূর্ত থেকেই পিতা-মাতার অবদান শুরু হয়। মাতৃগর্ভে দীর্ঘ দশ মাস সন্তানকে ধারণ করা এবং অসীম শারীরিক কষ্ট সহ্য করে তাকে পৃথিবীর আলো দেখানোর যে ত্যাগ একজন মা করেন, তা তুলনাহীন। অন্যদিকে, সন্তানের অন্ন, বস্ত্র, বাসস্থান এবং ভবিষ্যৎ নিশ্চিত করার জন্য একজন পিতা যে নির্ঘুম সংগ্রাম চালিয়ে যান, তা প্রায়শই আড়ালেই থেকে যায়।
  • শারীরিক ও মানসিক বিকাশ: একটি শিশু জন্মগ্রহণের পর সম্পূর্ণ অসহায় থাকে। তাকে খাওয়ানো, পরানো এবং সুস্থ রাখার জন্য পিতা-মাতা নিজেদের আরাম-আয়েশ বিসর্জন দেন।
  • শিক্ষাদান ও চরিত্র গঠন: সন্তানের প্রথম পাঠশালা হলো তার পরিবার। পিতা-মাতাই সন্তানকে ন্যায়-অন্যায়, নৈতিকতা ও মূল্যবোধের প্রথম শিক্ষা দেন, যা সন্তানের ভবিষ্যৎ জীবনকে পরিচালিত করে।
  • নিঃস্বার্থ সমর্থন: জীবনে সফল হলে সমাজ পাশে থাকে, কিন্তু ব্যর্থতার গ্লানিতে যখন সবাই মুখ ফিরিয়ে নেয়, তখন একমাত্র পিতা-মাতাই সন্তানের পাশে বটবৃক্ষের মতো ছায়া দিয়ে দাঁড়িয়ে থাকেন।

বিভিন্ন ধর্মীয় দৃষ্টিকোণে পিতা-মাতার মর্যাদা

পৃথিবীর প্রতিটি প্রধান ধর্ম ও দর্শনে পিতা-মাতাকে সর্বোচ্চ সম্মানের আসনে অধিষ্ঠিত করা হয়েছে। ধর্মীয় দৃষ্টিকোণ থেকে পিতা-মাতার প্রতি অবহেলা একটি চরম পাপ হিসেবে গণ্য হয়।
  • ইসলাম ধর্ম: ইসলামে পিতা-মাতার প্রতি সম্মান ও দায়িত্ব পালনকে ইবাদতের সমতুল্য বলা হয়েছে। পবিত্র কোরআনে আল্লাহর ইবাদতের পরপরই পিতা-মাতার সাথে সদ্ব্যবহার করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। বিখ্যাত হাদিস অনুযায়ী, “মায়ের পায়ের নিচে সন্তানের বেহেশত” এবং “পিতার সন্তুষ্টিতে আল্লাহর সন্তুষ্টি, পিতার অসন্তুষ্টিতে আল্লাহর অসন্তুষ্টি” নিহিত রয়েছে।
  • হিন্দু ধর্ম: সনাতন ধর্মে পিতা-মাতাকে দেবতার আসনে বসানো হয়েছে। উপনিষদে বলা হয়েছে, “মাতৃদেবো ভব, পিতৃদেবো ভব” (মা ও বাবাকে দেবতার তুল্য জ্ঞান করো)। মনুসংহিতায় বলা হয়েছে, “পিতা স্বর্গ, পিতা ধর্ম, পিতাই পরম তপস্যা।”
  • খ্রিষ্টান ও অন্যান্য ধর্ম: বাইবেলে দশ আজ্ঞার (Ten Commandments) অন্যতম হলো পিতা-মাতাকে সম্মান করা। বৌদ্ধ ধর্মেও পিতা-মাতার প্রতি সেবা ও কৃতজ্ঞতা প্রকাশকে অন্যতম প্রধান পুণ্যকর্ম হিসেবে বিবেচনা করা হয়।

পিতা-মাতার প্রতি সন্তানের প্রধান কর্তব্যসমূহ

পিতা-মাতা তাদের ত্যাগের বিনিময়ে সন্তানের কাছে কোনো বৈষয়িক বা আর্থিক প্রতিদান প্রত্যাশা করেন না। তাদের একমাত্র চাওয়া হলো সন্তানের ভালোবাসা, শ্রদ্ধা এবং শেষ বয়সে একটু নির্ভরতা।

১. বিনম্র আচরণ ও শ্রদ্ধা প্রদর্শন

পিতা-মাতার সাথে সবসময় বিনয়ী ও কোমল আচরণ করা সন্তানের প্রথম এবং প্রধান কর্তব্য। তাদের কথার অবাধ্য না হওয়া, তর্কে লিপ্ত না হওয়া এবং এমন কোনো কথা না বলা যা তাদের মনে কষ্ট দেয়। বয়সের ভারে তারা যদি কোনো ভুলও করেন, তবুও তাদের প্রতি কঠোর হওয়া অনুচিত।

২. ভরণপোষণ ও শারীরিক যত্ন

সন্তান যখন উপার্জনক্ষম হয়, তখন পিতা-মাতার অর্থনৈতিক দায়িত্ব গ্রহণ করা তার অবশ্য কর্তব্য। তাদের খাদ্য, বস্ত্র এবং বাসস্থানের কোনো অভাব যেন না থাকে, সেদিকে সতর্ক দৃষ্টি রাখতে হবে। বিশেষ করে তারা অসুস্থ হলে সর্বোচ্চ চিকিৎসা এবং সার্বক্ষণিক সেবা নিশ্চিত করতে হবে।

৩. সময় দেওয়া ও মানসিক সমর্থন

পিতা-মাতা যখন বৃদ্ধ হন, তখন তারা শারীরিকের চেয়ে মানসিকভাবে বেশি নিঃসঙ্গ হয়ে পড়েন। এ সময় তাদের সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন সন্তানের সাহচর্য। কর্মব্যস্ততার অজুহাতে তাদের সময় না দেওয়াটা একধরনের মানসিক নির্যাতন। প্রতিদিন অন্তত কিছু সময় তাদের সাথে গল্প করা, তাদের পরামর্শ নেওয়া এবং তাদের অনুভূতির মূল্য দেওয়া সন্তানের নৈতিক দায়িত্ব।
গুরুত্বপূর্ণ সতর্কতা:
বর্তমান ডিজিটাল যুগে সন্তানরা স্মার্টফোন ও সোশ্যাল মিডিয়ায় এতটাই মগ্ন থাকে যে, একই ছাদের নিচে বসবাস করেও পিতা-মাতার সাথে তাদের বিশাল মানসিক দূরত্ব তৈরি হচ্ছে। এই ‘ডিজিটাল ডিটাচমেন্ট’ বা বিচ্ছিন্নতা রোধে পারিবারিক আড্ডা বা একসাথে খাবার গ্রহণের অভ্যাস পুনরায় চালু করা অত্যন্ত জরুরি।

বার্ধক্যে পিতা-মাতা: বৃদ্ধাশ্রম বনাম পারিবারিক আশ্রয়

আধুনিক যুগের অন্যতম বড় সামাজিক অবক্ষয় হলো বৃদ্ধাশ্রমের বিস্তার। একসময় যে পিতা-মাতা নিজেদের সর্বস্ব বিলিয়ে সন্তানকে বড় করেছেন, সেই সন্তান যখন প্রতিষ্ঠিত হয়ে পিতা-মাতাকে ‘বোঝা’ মনে করে বৃদ্ধাশ্রমে রেখে আসে, তখন তা চরম অমানবিকতার পরিচয় বহন করে।
বার্ধক্য মানুষের জীবনের একটি স্বাভাবিক প্রক্রিয়া। এ সময়ে মানুষ শারীরিক সক্ষমতা হারায় এবং অনেকটা শিশুদের মতো আচরণ করতে শুরু করে। এ অবস্থায় পিতা-মাতার প্রয়োজন পারিবারিক আশ্রয় এবং নাতি-নাতনিদের কোলাহলপূর্ণ পরিবেশ, যা তাদের মানসিক প্রশান্তি দেয়। বৃদ্ধাশ্রম কখনোই একটি পরিবারের বিকল্প হতে পারে না। সন্তানকে মনে রাখতে হবে, আজ সে তার পিতা-মাতার সাথে যে আচরণ করছে, আগামী প্রজন্মের কাছেও তার জন্য ঠিক একই আচরণ অপেক্ষা করছে।

ঐতিহাসিক ও প্রেরণাদায়ী দৃষ্টান্ত

ইতিহাসের পাতায় এমন অসংখ্য মহামানবের নাম পাওয়া যায়, যারা পিতা-মাতার প্রতি অসীম ভক্তি ও সেবার মাধ্যমে জগতবিখ্যাত হয়েছেন।
  • বায়েজিদ বোস্তামী: মায়ের প্রতি অকৃত্রিম ভালোবাসার এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত হলেন হজরত বায়েজিদ বোস্তামী (রহ.)। অসুস্থ মায়ের এক গ্লাস পানির তৃষ্ণা মেটানোর জন্য শীতের রাতে তিনি সারারাত পানির গ্লাস হাতে মায়ের শিয়রে দাঁড়িয়ে ছিলেন। এই অসামান্য মাতৃভক্তির কারণেই তিনি আধ্যাত্মিকতার সর্বোচ্চ শিখরে পৌঁছাতে পেরেছিলেন।
  • ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর: মায়ের ডাকে সাড়া দিতে তিনি গভীর রাতে উত্তাল দামোদর নদ সাঁতরে পার হয়েছিলেন। তাঁর এই মাতৃভক্তি আজও সমাজে এক বিরল দৃষ্টান্ত হয়ে আছে।

উপসংহার

পিতা-মাতা হলেন সৃষ্টিকর্তার পক্ষ থেকে সন্তানের জন্য সবচেয়ে বড় আশীর্বাদ। তাদের দোয়ায় যেমন সন্তানের জীবন আলোকিত হয়, তেমনি তাদের দীর্ঘশ্বাসে জীবন ধ্বংসের মুখে পতিত হতে পারে। আধুনিক জীবনের ইঁদুরদৌড়ে আমরা যতই অর্থ ও যশের পেছনে ছুটি না কেন, পিতা-মাতার মুখে হাসি ফোটানোর চেয়ে বড় কোনো সফলতা পৃথিবীতে নেই। সুতরাং, প্রতিটি সন্তানের উচিত পিতা-মাতাকে বোঝা না ভেবে তাদের নিজের জীবনের সবচেয়ে মূল্যবান সম্পদ হিসেবে গ্রহণ করা। তাদের প্রতি ভালোবাসা, শ্রদ্ধা ও দায়িত্ব পালনের মাধ্যমেই সমাজ ব্যবস্থা সুন্দর, মানবিক এবং মূল্যবোধসম্পন্ন হয়ে উঠতে পারে।

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।