কবিতার মূল তথ্য:
| বিষয়বিবরণ | তথ্য |
| কবিতার নাম | প্রতীক্ষা |
| কবির নাম | রফিক আজাদ |
| কবিতার ধরন | আধুনিক প্রেমের কবিতা (Modern Love Poem) |
কবি পরিচিতি ও প্রেক্ষাপট:
সম্পূর্ণ কবিতা:
এমন অনেক দিন গেছে
আমি অধীর আগ্রহে অপেক্ষায় থেকেছি,
হেমন্তে পাতা-ঝরার শব্দ শুনবো ব’লে
নিঃশব্দে অপেক্ষা করেছি বনভূমিতে-
কোনো বন্ধুর জন্যে
কিংবা অন্য অনেকের জন্যে
হয়তো বা ভবিষ্যতেও অপেক্ষা করবো…
এমন অনেক দিনই তো গেছে
কারো অপেক্ষায় বাড়ি ব’সে আছি-
হয়তো কেউ বলেছিলো, “অপেক্ষা ক’রো
একসঙ্গে বেরুবো।”
এক শনিবার রাতে খুব ক্যাজুয়ালি
কোনো বন্ধু ঘোরের মধ্যে গোঙানির মতো
উচ্চারণ করেছিলো, “বাড়ি থেকো
ভোরবেলা তোমাকে তুলে নেবো।”
হয়তো বা ওর মনের মধ্যে ছিলো
চুনিয়া অথবা শ্রীপুর ফরেস্ট বাংলো;
-আমি অপেক্ষায় থেকেছি।
যুদ্ধের অনেক আগে
একবার আমার প্রিয়বন্ধু অলোক মিত্র
ঠাট্টা ক’রে বলেছিলো,
“জীবনে তো কিছুই দেখলি না
ন্যুব্জপীঠ পানশালা ছাড়া। চল, তোকে
দিনাজপুরে নিয়ে যাবো
কান্তজীর মন্দির ও রামসাগর দেখবি,
বিরাট গোলাকার চাঁদ মস্ত খোলা আকাশ দেখবি,
পলা ও আধিয়ারদের জীবন দেখবি,
গল্প-টল্প লেখার ব্যাপারে কিছু উপাদান
পেয়ে যেতেও পারিস,
তৈরী থাকিস- আমি আসবো”
-আমি অপেক্ষায় থেকেছি;
আমি বন্ধু, পরিচিত-জন, এমনকি- শত্রুর জন্যেও
অপেক্ষায় থেকেছি,
বন্ধুর মধুর হাসি আর শত্রুর ছুরির জন্যে
অপেক্ষায় থেকেছি-
কিন্তু তোমার জন্য আমি অপেক্ষায় থাকবো না,
-প্রতীক্ষা করবো।
‘প্রতীক্ষা’ শব্দটি আমি শুধু তোমারই জন্যে খুব যত্নে
বুকের তোরঙ্গে তুলে রাখলাম,
অভিধানে শব্দ-দু’টির তেমন কোনো
আলাদা মানে নেই-
কিন্তু আমরা দু’জন জানি
ঐ দুই শব্দের মধ্যে পার্থক্য অনেক,
‘অপেক্ষা’ একটি দরকারি শব্দ—
আটপৌরে, দ্যোতনাহীন, ব্যঞ্জনাবিহীন,
অনেকের প্রয়োজন মেটায়।
‘প্রতীক্ষা’ই আমাদের ব্যবহার্য সঠিক শব্দ,
ঊনমান অপর শব্দটি আমাদের ব্যবহারের অযোগ্য,
আমরা কি একে অপরের জন্যে প্রতীক্ষা করবো না ?
আমি তোমার জন্যে পথপ্রান্তে অশ্বত্থের মতো
দাঁড়িয়ে থাকবো-
ঐ বৃক্ষ অনন্তকাল ধ’রে যোগ্য পথিকের
জন্যে প্রতীক্ষমান,
আমাকে তুমি প্রতীক্ষা করতে বোলো
আমি ঠায় দাঁড়িয়ে থাকবো অনড় বিশ্বাসে,
দাঁড়িয়ে থাকতে-থাকতে
আমার পায়ে শিকড় গজাবে…
আমার প্রতীক্ষা তবু ফুরোবে না…
সম্পূর্ণ কবিতার Romanized Version:
কবিতার মূল ভাব ও বিশ্লেষণ:
- অপেক্ষা ও প্রতীক্ষার সূক্ষ্ম পার্থক্য:“অভিধানে শব্দ-দু’টির তেমন কোনো / আলাদা মানে নেই- / কিন্তু আমরা দু’জন জানি / ঐ দুই শব্দের মধ্যে পার্থক্য অনেক,”— শাব্দিক অর্থে ‘অপেক্ষা’ ও ‘প্রতীক্ষা’ সমার্থক হলেও, কবির কাছে এ দুটির আবেগিক মূল্য সম্পূর্ণ ভিন্ন। ‘অপেক্ষা’ হলো দৈনন্দিন জীবনের আটপৌরে ও সাধারণ একটি কাজ, যা বন্ধু বা শত্রুর জন্য করা যায়। কিন্তু ‘প্রতীক্ষা’ হলো এক গভীর, পবিত্র ও শাশ্বত সাধনা, যা কেবল প্রিয়জনের জন্যই সংরক্ষিত।
- প্রাত্যহিক জীবনের চিত্র:“বন্ধুর মধুর হাসি আর শত্রুর ছুরির জন্যে / অপেক্ষায় থেকেছি-“— কবি তাঁর জীবনে হেমন্তের পাতা ঝরা থেকে শুরু করে বন্ধুদের সাথে আড্ডা, ঘোরাঘুরি বা শত্রুর আঘাতের জন্য যে সময় ব্যয় করেছেন, তাকে অত্যন্ত সাধারণ ও প্রাত্যহিক ‘অপেক্ষা’ হিসেবেই দেখেছেন।
- অনন্ত প্রেমের মহিমা ও অটল বিশ্বাস:“আমি তোমার জন্যে পথপ্রান্তে অশ্বত্থের মতো / দাঁড়িয়ে থাকবো- … / দাঁড়িয়ে থাকতে-থাকতে / আমার পায়ে শিকড় গজাবে… / আমার প্রতীক্ষা তবু ফুরোবে না…”— কবিতার এই সমাপ্তি অংশটি প্রেমের এক চূড়ান্ত নিদর্শন। অশ্বত্থ গাছ যেমন যুগ যুগ ধরে স্থিরভাবে দাঁড়িয়ে থাকে, তেমনি কবিও অনন্তকাল ধরে তাঁর প্রেমিকার জন্য প্রতীক্ষা করতে প্রস্তুত। এই প্রতীক্ষায় তাঁর পায়ে শিকড় গজালেও সেই অপেক্ষার কোনো শেষ হবে না।
উৎস:
প্রতীক্ষা কবিতা আবৃত্তি ঃ