বাংলা গুরুকুল, GOLN

আমার শখ, আমার প্রিয় শখ প্রতিবেদন রচনা। Essay on My Hobby শখের কাজ বিষয়ে  – নিচে উপস্থাপিত প্রবন্ধটি কেবল একটি আদর্শ নমুনা বা লিখন শৈলীর উদাহরণ হিসেবে তৈরি করা হয়েছে। আমাদের মূল লক্ষ্য হলো শিক্ষার্থীদের মধ্যে রচনার কাঠামো, উন্নত শব্দচয়ন এবং ভাব প্রকাশের দক্ষতা তৈরি করা। আমরা উৎসাহিত করি যে, তোমরা এই নমুনাটি থেকে ধারণা নিয়ে নিজের অভিজ্ঞতা ও সৃজনশীলতা ব্যবহার করে নিজস্ব ভাষায় রচনাটি লেখার চেষ্টা করবে। মনে রাখবে, মুখস্থ বিদ্যা নয়, বরং স্বকীয় লিখনশৈলীই হলো সার্থক শিক্ষা। তোমাদের নিজস্ব আবেগ ও দৃষ্টিভঙ্গি যখন কলমে ফুটে উঠবে, তখনই সেটি একটি প্রকৃত রচনা হয়ে উঠবে।

প্রবন্ধ রচনা: আমার শখ (বই পড়া)

ভূমিকা: শখের জীবনদর্শন ও গুরুত্ব

মানুষের জীবন কেবল অন্ন-বস্ত্রের সংস্থানে বা যান্ত্রিক কর্মব্যস্ততায় সীমাবদ্ধ নয়। প্রতিদিনের রুটিনমাফিক কাজের চাপে যখন মানবাত্মা হাঁপিয়ে ওঠে, তখন তার প্রয়োজন হয় এক পশলা প্রশান্তির বৃষ্টি। এই মানসিক প্রশান্তি ও হৃদয়ের আনন্দ লাভের জন্য মানুষ তার অবসর সময়ে যে সৃজনশীল ও সৃজনধর্মী কাজে নিজেকে ব্যাপৃত রাখে, তাকেই আমরা ‘শখ’ বলে অভিহিত করি। শখ হলো মনের বাতায়ন, যার মধ্য দিয়ে বাইরের জগতের আলো-হাওয়া আমাদের চেতনার অন্দরমহলে প্রবেশ করে। শখ বৈচিত্র্যময় হতে পারে—কারো কাছে তা বাগান করা, কারো কাছে ছবি আঁকা, ডাকটিকিট সংগ্রহ কিংবা অজানাকে জানার উদ্দেশ্যে দেশ-বিদেশে ভ্রমণ। তবে আমার জীবনে যা ধ্রুবতারার মতো উজ্জ্বল এবং আত্মার অবিচ্ছেদ্য অংশ, তা হলো ‘বই পড়া’। বই আমার কাছে কেবল কাগজের সমষ্টি নয়, বরং তা মহাকালের কণ্ঠস্বর।

শখের সূচনা ও আমার পঠনবিশ্ব

বই পড়ার প্রতি আমার এই অনুরাগের বীজ বপন হয়েছিল আমার অতি শৈশবে। যখন আমি বর্ণমালার সাথে সবে পরিচিত হচ্ছি, তখন রূপকথার বইগুলোর রঙিন প্রচ্ছদ আমাকে এক জাদুকরী জগতের হাতছানি দিত। বড় হওয়ার সাথে সাথে সেই রূপকথা রূপান্তরিত হয়েছে বিশ্বসাহিত্যের অমূল্য ভাণ্ডারে। স্কুল-কলেজের পাঠ্যবই আমাদের জীবনের বৈষয়িক উন্নতির পথ দেখায় সত্য, কিন্তু গল্পের বই বা সাহিত্যের বই আমাদের শেখায় জীবনের প্রকৃত রস আস্বাদন করতে। দিনের শেষে যখন নিস্তব্ধ দুপুরে বা শান্ত সন্ধ্যায় আমি একটি বই নিয়ে বসি, তখন চারপাশের কোলাহল স্থিমিত হয়ে আসে। আমি তখন আর আমার পড়ার ঘরে সীমাবদ্ধ থাকি না; আমি তখন বিচরণ করি অমর সব চরিত্রদের মিছিলে।

বই কেন আমার শ্রেষ্ঠ শখ: এক আধ্যাত্মিক সংযোগ

বই পড়ার শখটি আমার কাছে অন্য সব শখের চেয়ে শ্রেষ্ঠ মনে হয় কারণ এর মাধ্যমে আমি কালজয়ী মহাপুরুষদের মস্তিস্কের ভাগীদার হতে পারি। মহান দার্শনিক গ্যেটে বলেছিলেন, “একটি ভালো বই পাঠ করা মানে একজন অতি উন্নত মানের মানুষের সাথে কথা বলা।” বই পড়ার মাধ্যমে আমি ঘরে বসেই পৃথিবীর ইতিহাস, বিজ্ঞান, দর্শন এবং সংস্কৃতির সাথে পরিচিত হতে পারি। ভ্রমণ করার সুযোগ সবার সবসময় হয় না, কিন্তু একটি ভালো ভ্রমণকাহিনী আমাদের মানসভ্রমণে নিয়ে যেতে পারে সুদূর আন্দিজ পর্বতমালা কিংবা মেরু অঞ্চলের তুষারশুভ্র প্রান্তরে। বই পড়ার মাধ্যমেই আমি বুঝতে শিখেছি যে, মানুষের দুঃখ-বেদনা, জয়-পরাজয় এবং সংগ্রামের রূপটি সব দেশে এবং সব কালেই প্রায় অভিন্ন। এটি আমার মধ্যে এক বিশ্বজনীন সহমর্মিতা ও উদার নৈতিকতাবোধ জাগ্রত করেছে।

পঠনরুচি ও সাহিত্যের বৈচিত্র্য

আমার পাঠের জগতটি কোনো নির্দিষ্ট গণ্ডিতে আবদ্ধ নয়। আমি মূলত একজন বিচিত্রগামী পাঠক। তবে ইতিহাসের রোমাঞ্চকর উপাখ্যান এবং রহস্যভেদ আমার মজ্জাগত পছন্দ। ইতিহাস আমাকে শেখায় অতীত থেকে শিক্ষা নিতে। যখন আমি শরদিন্দু বন্দ্যোপাধ্যায়ের ‘গৌড়মল্লার’ বা ‘তুঙ্গভদ্রার তীরে’ পড়ি, তখন মধ্যযুগের বাংলার শৌর্য-বীর্য আমার চোখের সামনে জীবন্ত চলচ্চিত্র হয়ে ভেসে ওঠে। আবার যখন বিজ্ঞানের জয়যাত্রার কথা পড়ি, তখন মহাকাশের ব্ল্যাক হোল কিংবা কোয়ান্টাম মেকানিক্সের রহস্য আমাকে বিস্মিত করে। সত্যজিৎ রায়ের ‘ফেলুদা’ সিরিজের প্রতিটি গল্প আমাকে লজিক বা যুক্তির শক্তিতে বলীয়ান হতে শিখিয়েছে। বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়ের ‘আরণ্যক’ বা ‘পথের পাঁচালী’ পড়লে আমি প্রকৃতির নিবিড় সান্নিধ্য অনুভব করি, যা আমাকে পরিবেশ সচেতন ও সংবেদনশীল মানুষ হিসেবে গড়ে তুলেছে।

আমার প্রিয় বই: চাঁদের পাহাড় ও অদম্য ইচ্ছাশক্তি

আমার সংগ্রহের হাজারো বইয়ের ভিড়ে বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়ের ‘চাঁদের পাহাড়’ উপন্যাসের স্থান সবার উপরে। এটি কেবল একটি অ্যাডভেঞ্চার কাহিনী নয়, বরং মানুষের অদম্য সাহসের এক দলিল। শংকরের মধ্যবিত্ত জীবনের বন্দিদশা থেকে মুক্তির আকাঙ্ক্ষা এবং আফ্রিকার দুর্গম জঙ্গল ও মরুভূমিতে তার টিকে থাকার লড়াই আমাকে প্রচণ্ডভাবে অনুপ্রাণিত করে। বৃদ্ধ অভিযাত্রী আলভারেজের সেই উক্তিটি আমার হৃদয়ে গেঁথে আছে— “মানুষের সাহসের সীমা নেই, ইচ্ছা করলে সে অসাধ্য সাধন করতে পারে।” যতবার আমি এই বইটি পড়ি, ততবারই আমি নিজের জীবনের ছোটখাটো বাধাগুলোকে অতিক্রম করার প্রেরণা পাই। রিচার্ড বার্টনের অভিযাত্রী জীবন কিংবা বিভীষিকাময় বুনিইপের উপকথা আমাকে অজানাকে জানার দুর্নিবার নেশায় মত্ত করে তোলে।

বই পড়ার সুফল ও চরিত্র গঠন

বই পড়ার শখ কেবল আনন্দদায়কই নয়, এর সুফল সুদূরপ্রসারী। আধুনিক যুগে আমরা যখন সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম এবং স্মার্টফোনের স্ক্রিনে আসক্ত হয়ে পড়ছি, তখন বই আমাদের মনোযোগ বা ‘কনসেনট্রেশন’ বৃদ্ধি করতে সাহায্য করে। নিয়মিত বই পড়ার ফলে আমার শব্দভাণ্ডার সমৃদ্ধ হয়েছে, যা আমাকে স্পষ্টভাবে মনের ভাব প্রকাশে সাহায্য করে। এটি আমার কল্পনাশক্তিকে শাণিত করেছে এবং অন্যের বিপদে সহমর্মী হতে শিখিয়েছে। একজন পাঠক হিসেবে আমি অনুভব করি, যারা বই পড়ে না, তারা কেবল একটি জীবন যাপন করে; কিন্তু যারা বই পড়ে, তারা হাজারো মানুষের জীবন ও অভিজ্ঞতার স্বাদ পায়। বই আমাকে একাকীত্ব থেকে মুক্তি দিয়েছে এবং বিষণ্ণতার মুহূর্তে শ্রেষ্ঠ সান্ত্বনা প্রদান করেছে।

শখ ও ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা: একটি ব্যক্তিগত পাঠাগারের স্বপ্ন

আমার এই প্রিয় শখটিকে আমি কেবল নিজের মধ্যেই সীমাবদ্ধ রাখতে চাই না। বর্তমানে আমার ব্যক্তিগত সংগ্রহের পরিমাণ প্রায় ৫০০ ছাড়িয়েছে। আমার ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা হলো বড় হয়ে একটি সমৃদ্ধ ব্যক্তিগত পাঠাগার বা লাইব্রেরি গড়ে তোলা। বর্তমান যুগে পাঠাগারের প্রয়োজনীয়তা অনস্বীকার্য। আমি চাই আমার সংগৃহীত বইগুলো যেন পাড়ার অন্যান্য শিশু-কিশোররা পড়ার সুযোগ পায়। জ্ঞানের আলো যেমন আমাকে আলোকিত করেছে, তেমনি সেই আলো দশজনের মাঝে বিলিয়ে দেওয়াই হবে আমার সার্থকতা। আমি বিশ্বাস করি, একটি সমৃদ্ধ পাঠাগার দশটি হাসপাতালের চেয়েও বেশি মানসিক স্বাস্থ্য রক্ষা করতে সক্ষম। এছাড়া আমি বিভিন্ন দুষ্প্রাপ্য ও বিলুপ্তপ্রায় পাণ্ডুলিপি সংগ্রহ করার একটি সুপ্ত পরিকল্পনা লালন করি।

উপসংহার: শখ যখন জীবনের মেরুদণ্ড

পরিশেষে বলা যায়, বই পড়ার শখ আমার জীবনের কেবল একটি অংশ নয়, বরং তা আমার জীবনের মেরুদণ্ড। অনেক সময় বই পড়ার নেশায় আমি খাওয়া-দাওয়া বা ঘুমের কথা ভুলে যাই, এমনকি পাঠ্যবইয়ের নিচে গল্পের বই রেখে পড়ার অপরাধে মা-বাবার কাছে বকাও খেয়েছি। কিন্তু সেই বকুনি আজ মধুর স্মৃতি মনে হয়। কারণ বই আমাকে যা দিয়েছে, তা কোনো পার্থিব সম্পদ দিয়ে পরিমাপ করা সম্ভব নয়। বই পড়ার মাধ্যমেই আমি শিখেছি সময়ের সঠিক মূল্যায়ন করতে এবং মানবিক গুণাবলী অর্জন করতে। ওমর খৈয়ামের সেই বিখ্যাত পঙক্তির কথা মনে পড়ে— “রুটি মদ ফুরিয়ে যাবে, প্রিয়ার কালো চোখ ঘোলাটে হয়ে আসবে, কিন্তু একখানা বই অনন্তকাল যৌবনা যদি সে বইখানা সত্যিই বইয়ের মতো বই হয়।” জীবনের প্রতিটি বাঁকে বই হোক আমার পথপ্রদর্শক এবং আত্মার পরম বন্ধু।

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।