বিপত্নীকের বউ – মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়
প্রতিমার বাবা নেহাত গরিব নন, প্রতিমাকেও দেখিতে নেহাত খারাপ বলা যায় না। আরো কিছুদিন চেষ্টা করিলে বিবাহের অভিজ্ঞতাবিহীন ভালো একটি কুমার বর তার জন্য অবশ্যই জোগাড় করা যাইত। তবু বিপত্নীক রমেশের হাতে তাকে সমর্পণ করাই বাপ-মা ভালো মনে করিলেন। একবার বিবাহ হইয়াছিল এবং বছর ছয়েক বয়সের একটি ছেলে আছে, এ দুটি খুঁত ছাড়া পাত্র হিসাবে […]
কুষ্ঠ-রোগীর বউ – মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়
কোনো নৈসর্গিক কারণ থাকে কি না ভগবান জানেন, মাঝে মাঝে মানুষের কথা আশ্চর্য রকম ফলিয়া যায়। সমবেত ইচ্ছাশক্তির মর্যাদা দিবার জন্যও ভগবান বিনিদ্র রজনী যাপন করেন না, মানুষের মর্মাহত অভিশাপের অর্থও জ্বালাময় অক্ষমতা ঘোষণা করার অতিরিক্ত আর কিছুই নয়। তবু মাঝে মাঝে প্ৰতিফল ফলিয়া যায়, বিষাক্ত এবং ভীষণ এ কথা কে না জানে যে পরের […]
সর্ববিদ্যাবিশারদের বউ – মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়
বিবাহের রাত্রেই নিবারণ ডান দিকের স্ত্রীকে বাঁ দিকে চালান করিয়া দিয়াছিল। তুমি এ পাশে এসে শোও, কেমন? এই তার প্রথম প্রেমালাপ। সুকুমারী একটু ভীরু আর ভাবপ্রবণ মেয়ে, তার আশঙ্কা আর আশা দুইই ছিল অন্যরকমের। ব্যাপারটা সে বুঝিয়া উঠিতে পারে নাই, কিন্তু কারণ জানিবার চেষ্টাও করে নাই। কে জানে, ডান দিকের কোনো অঙ্গপ্রত্যঙ্গে হয়তো ব্যথাট্যাথা হইয়াছে […]
রাজার বউ – মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়
কুড়ি বছর বয়স হইতে যামিনী রানী I যামিনীর স্বামী ভূপতির রাজ্য কিন্তু একটা বড় জমিদারি মাত্র। বছরে লাখ দেড়েক টাকার বেশি আয় হয় না। ভূপতি রাজা শুধু উপাধির জোরে। যামিনীও সুতরাং অভিধান সম্মত আসল রাজার রানী নয়। উপাধির রানী। রাজার বউ। ভূপতিরা মোটে তিন পুরুষের রাজা। কলিকাতায় অনেকগুলো অপ্রশস্ত গলি আছে। তাদের একটার মধ্যে মাঝারি […]
পূজারির বউ – মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়
বাহিরে অমাবস্যার গাঢ় অন্ধকারে অবলুপ্ত পৃথিবীকে এত রাত্রে শুধু কয়েকটি রহস্যময় শব্দের সাহায্যে চিনিতে হয়। কাদম্বিনীর চোখে ঘুম নাই। বিছানায় উঠিয়া বসিয়া কান পাতিয়া সে রাত্রির প্রত্যেকটি দুর্বোধ্য ভাষা শুনিতে থাকে। ঝিঁঝির শব্দ এমনই একটানা বিরামহীন যে থাকিয়া থাকিয়া আপনা হইতে তাহার শুনিবার অনুভূতি বিরাম নেয়। চেষ্টা করিয়াও আর যেন ডাক শোনা যায় না। ঘরের পিছনে […]
প্রৌঢ়ের বউ – মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়
রসিকের প্রৌঢ়ত্বের সবচেয়ে বড় প্রমাণ এই মৃত্যুভয়। মরণের অবিরাম গুঞ্জন, আমি আসিতেছি, আমি আসিতেছি, শুনিয়াও না শুনিবার সতেজ ঔদ্ধত্য ঝিমাইয়া পড়ায় এই বয়সে মানুষের প্রথম খেয়াল হয়, দূর হইতে মরণ আশ্বাস দিয়া বলিতেছে, এখনো সময় হয় নাই, একটু অপেক্ষা কর। মরণের স্বাদ পাইতে পাইতে বৃদ্ধ ভাবে, দেরি আছে, এখনো দেরি আছে : জীবন বিস্বাদ হওয়ায় […]
উদারচরিতানামের বউ – মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়
যতীনের মতো মজলিশি মিশুক মানুষ দেখা যায় না। বেঁটে গোলগাল মানুষটা, চিকন চামড়া ঢাকা একটু চ্যাপটা ধরনের মুখখানিতে হাসিখুশি ভাবটাই বেশি সময় বজায় থাকে, তবে সময়বিশেষে সমবেদনাভরা গাম্ভীর্য, সংশয়ভরা জিজ্ঞাসু আশঙ্কা, বিচারহীন নির্বিকার ক্ষমা, দুঃখ, ক্ষোভ, মায়ামোহ এসব ভাবও এমন পরিষ্কার ফুটিয়া থাকে যে পটের ছবিও তার চেয়ে স্পষ্ট নয়। গলার আওয়াজটা একটু মোটা। কিন্তু […]
হলুদ নদী সবুজ বন – মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়
‘হলুদ নদী সবুজ বন’ মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের একটি গুরুত্বপূর্ণ ও ব্যতিক্রমী উপন্যাস। উপন্যাসটি তাঁর মৃত্যুর বছরেই (১৯৫৬) প্রকাশিত হয়, ফলে এটি বাংলা সাহিত্যে মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের এক ধরনের উত্তরাধিকারী রচনা হিসেবেও বিবেচিত। জীবনের শেষ প্রান্তে দাঁড়িয়ে লেখা এই উপন্যাসে তাঁর জীবনদর্শন, রাজনৈতিক চেতনা ও মানবিক উপলব্ধি আরও পরিণত ও গভীর রূপে প্রকাশ পেয়েছে। এই উপন্যাসের পটভূমি মূলত […]
জুয়াড়ির বউ – মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়
ধরিতে গেলে জুয়ার দিকে মাখনের ঝোঁক ছিল ছেলেবেলা হইতেই। তার অল্প বয়সের খেয়াল আর খেলাগুলির মধ্যে তার ভবিষ্যৎ জীবনের এমন জোরালো মানসিক বিকারের সূচনা অবশ্য কেউ কল্পনা করিতে পারিত না। বাজি ধরে না কে, লটারির টিকিট কেনে না কে, মেলায় গেলে নম্বর লেখা টেবিলে দু-চারটা পয়সা দিয়া ঘূর্ণমান চাকায় লেখা নম্বরের দিকে তীর ছোড়ে না […]
অন্ধের বউ – মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়
বিবাহের এক বছর পরে ধীরাজ অন্ধ হইয়া গেল। চোখের একটা অসুখ আছে, বড় বিপজ্জনক অসুখ, চোখের ভিতরের চাপ যাতে বাড়িয়া যায়। অবস্থাবিশেষে এক দিনের মধ্যেই মানুষের দৃষ্টিশক্তি নষ্ট হইয়া যাইতে পারে। আগের দিনটা ছিল বিবাহের বার্ষিক তিথি। রাত্রিটা দুজনে জাগিয়া কাটাইয়া দিয়াছিল! সারা রাত কয়েক মিনিটের জন্যও চোখ না বুজিয়া প্রতিদিন সকালে একেবারে সূর্যের মুখ না […]