বাংলা গুরুকুল, GOLN

আধুনিক বাংলা কবিতার অন্যতম প্রধান কবি রফিক আজাদের ‘প্রতীক্ষা’ একটি অসামান্য মনস্তাত্ত্বিক ও প্রেমের কবিতা। এই কবিতায় কবি প্রাত্যহিক জীবনের সাধারণ অপেক্ষার সাথে প্রিয়জনের জন্য অনন্ত ও গভীর প্রতীক্ষার এক সূক্ষ্ম পার্থক্য রচনা করেছেন। কবিতাটির গভীরতা ও আবেগ এতটাই সর্বজনীন যে, অ্যালেক্স রাদারফোর্ডের মতো অনুবাদকরা এটিকে ইংরেজিতে অনুবাদ করে বিশ্বপরিসরে বাংলা সাহিত্যের সৌন্দর্যকে তুলে ধরেছেন।

কবিতার মূল তথ্য:

বিষয়বিবরণতথ্য
কবিতার নামপ্রতীক্ষা
কবির নামরফিক আজাদ
কবিতার ধরনআধুনিক প্রেমের কবিতা (Modern Love Poem)

কবি পরিচিতি ও প্রেক্ষাপট:

রফিক আজাদ বাংলাদেশের একজন খ্যাতনামা আধুনিক কবি, যাঁর কবিতায় দেশ, প্রেম, সংগ্রাম ও স্বপ্নের এক সূক্ষ্ম সংমিশ্রণ দেখা যায়। তাঁর কবিতায় নাগরিক জীবনের বাস্তবতা এবং রোমান্টিক চেতনার চমৎকার মেলবন্ধন রয়েছে। ‘প্রতীক্ষা’ কবিতায় একজন অপেক্ষমাণ মানুষের অন্তর্জগৎ ফুটে উঠেছে। জীবনে বন্ধু, শত্রু বা প্রকৃতির জন্য মানুষের যে সাধারণ অপেক্ষা থাকে, তাকে তিনি ‘অপেক্ষা’ বলেছেন। কিন্তু নিজের ভালোবাসার মানুষের জন্য তিনি যে শাশ্বত ও অনন্ত সময়ের জন্য দাঁড়িয়ে থাকতে প্রস্তুত, তাকে তিনি অভিধানের গণ্ডি ছাড়িয়ে ‘প্রতীক্ষা’ হিসেবে এক পবিত্র রূপ দিয়েছেন।

সম্পূর্ণ কবিতা:

এমন অনেক দিন গেছে
আমি অধীর আগ্রহে অপেক্ষায় থেকেছি,
হেমন্তে পাতা-ঝরার শব্দ শুনবো ব’লে
নিঃশব্দে অপেক্ষা করেছি বনভূমিতে-
কোনো বন্ধুর জন্যে
কিংবা অন্য অনেকের জন্যে
হয়তো বা ভবিষ্যতেও অপেক্ষা করবো…
এমন অনেক দিনই তো গেছে
কারো অপেক্ষায় বাড়ি ব’সে আছি-
হয়তো কেউ বলেছিলো, “অপেক্ষা ক’রো
একসঙ্গে বেরুবো।”

এক শনিবার রাতে খুব ক্যাজুয়ালি
কোনো বন্ধু ঘোরের মধ্যে গোঙানির মতো
উচ্চারণ করেছিলো, “বাড়ি থেকো
ভোরবেলা তোমাকে তুলে নেবো।”
হয়তো বা ওর মনের মধ্যে ছিলো
চুনিয়া অথবা শ্রীপুর ফরেস্ট বাংলো;
-আমি অপেক্ষায় থেকেছি।

যুদ্ধের অনেক আগে
একবার আমার প্রিয়বন্ধু অলোক মিত্র
ঠাট্টা ক’রে বলেছিলো,
“জীবনে তো কিছুই দেখলি না
ন্যুব্জপীঠ পানশালা ছাড়া। চল, তোকে
দিনাজপুরে নিয়ে যাবো
কান্তজীর মন্দির ও রামসাগর দেখবি,
বিরাট গোলাকার চাঁদ মস্ত খোলা আকাশ দেখবি,
পলা ও আধিয়ারদের জীবন দেখবি,
গল্প-টল্প লেখার ব্যাপারে কিছু উপাদান
পেয়ে যেতেও পারিস,
তৈরী থাকিস- আমি আসবো”
-আমি অপেক্ষায় থেকেছি;

আমি বন্ধু, পরিচিত-জন, এমনকি- শত্রুর জন্যেও
অপেক্ষায় থেকেছি,
বন্ধুর মধুর হাসি আর শত্রুর ছুরির জন্যে
অপেক্ষায় থেকেছি-

কিন্তু তোমার জন্য আমি অপেক্ষায় থাকবো না,
-প্রতীক্ষা করবো।
‘প্রতীক্ষা’ শব্দটি আমি শুধু তোমারই জন্যে খুব যত্নে
বুকের তোরঙ্গে তুলে রাখলাম,
অভিধানে শব্দ-দু’টির তেমন কোনো
আলাদা মানে নেই-
কিন্তু আমরা দু’জন জানি
ঐ দুই শব্দের মধ্যে পার্থক্য অনেক,
‘অপেক্ষা’ একটি দরকারি শব্দ—
আটপৌরে, দ্যোতনাহীন, ব্যঞ্জনাবিহীন,
অনেকের প্রয়োজন মেটায়।
‘প্রতীক্ষা’ই আমাদের ব্যবহার্য সঠিক শব্দ,
ঊনমান অপর শব্দটি আমাদের ব্যবহারের অযোগ্য,
আমরা কি একে অপরের জন্যে প্রতীক্ষা করবো না ?

আমি তোমার জন্যে পথপ্রান্তে অশ্বত্থের মতো
দাঁড়িয়ে থাকবো-
ঐ বৃক্ষ অনন্তকাল ধ’রে যোগ্য পথিকের
জন্যে প্রতীক্ষমান,
আমাকে তুমি প্রতীক্ষা করতে বোলো
আমি ঠায় দাঁড়িয়ে থাকবো অনড় বিশ্বাসে,
দাঁড়িয়ে থাকতে-থাকতে
আমার পায়ে শিকড় গজাবে…

আমার প্রতীক্ষা তবু ফুরোবে না…

 

সম্পূর্ণ কবিতার Romanized Version:

Emon onek din geche
Ami odhir agrohe opekkhay thekechi,
Hemonte pata-jhorar shobdo shunbo bo’le
Nishshobde opekkha korechi bonobhumite-
Kono bondhur jonne
Kingba onno oneker jonne
Hoyto ba bhobishyoteo opekkha korbo…
Emon onek dinii to geche
Karo opekkhay bari bo’she achi-
Hoyto keu bolechilo, “Opekkha ko’ro
Ekshonge berubo.”
Ek shonibar rate khub casually
Kono bondhu ghorer modhye gonganir moto
Uccharon korechilo, “Bari theko
Bhorebela tomake tule nebo.”
Hoyto ba or moner modhye chilo
Chunia othoba Sreepur forest bungalow;
-Ami opekkhay thekechi.
Juddher onek age
Ekbar amar priyobondhu Olok Mitro
Thatta ko’re bolechilo,
“Jibone to kichui dekhli na
Njubjopith panshala chara. Chol, toke
Dinajpure niye jabo
Kantojir mondir o Ramsagor dekhbi,
Birat golakar chand mosto khola akash dekhbi,
Pola o adhiyarder jibon dekhbi,
Golpo-tolpo lekhar byapare kichu upadan
Peye jeteo parish,
Toiri thakish- ami ashbo”
-Ami opekkhay thekechi;
Ami bondhu, porichito-jon, emonki- shotrur jonneo
Opekkhay thekechi,
Bondhur modhur hashi ar shotrur churir jonne
Opekkhay thekechi-
Kintu tomar jonno ami opekkhay thakbo na,
-Protikkha korbo.
‘Protikkha’ shobdoti ami shudhu tomari jonne khub jotne
Buker toronge tule rakhlam,
Obhidhane shobdo-du’tir temon kono
Alada mane nei-
Kintu amra du’jon jani
Oi dui shobder modhye parthokko onek,
‘Opekkha’ ekti dorkari shobdo—
Atpoure, dyotonahin, byanjonabihin,
Oneker proyojon metay.
‘Protikkha’i amader byaboharjo shothik shobdo,
Unoman opor shobdoti amader byaboharer ojogyo,
Amra ki eke oporer jonne protikkha korbo na ?
Ami tomar jonne pothoprante oshwotther moto
Dariye thakbo-
Oi brikkho onontokal dho’re joggo pothiker
Jonne protikkhoman,
Amake tumi protikkha korte bolo
Ami thay dariye thakbo onor bisshashe,
Dariye thakte-thakte
Amar paye shikor gojabe…
Amar protikkha tobu phurobe na…

কবিতার মূল ভাব ও বিশ্লেষণ:

  • অপেক্ষা ও প্রতীক্ষার সূক্ষ্ম পার্থক্য:
    “অভিধানে শব্দ-দু’টির তেমন কোনো / আলাদা মানে নেই- / কিন্তু আমরা দু’জন জানি / ঐ দুই শব্দের মধ্যে পার্থক্য অনেক,”
    — শাব্দিক অর্থে ‘অপেক্ষা’ ও ‘প্রতীক্ষা’ সমার্থক হলেও, কবির কাছে এ দুটির আবেগিক মূল্য সম্পূর্ণ ভিন্ন। ‘অপেক্ষা’ হলো দৈনন্দিন জীবনের আটপৌরে ও সাধারণ একটি কাজ, যা বন্ধু বা শত্রুর জন্য করা যায়। কিন্তু ‘প্রতীক্ষা’ হলো এক গভীর, পবিত্র ও শাশ্বত সাধনা, যা কেবল প্রিয়জনের জন্যই সংরক্ষিত।
  • প্রাত্যহিক জীবনের চিত্র:
    “বন্ধুর মধুর হাসি আর শত্রুর ছুরির জন্যে / অপেক্ষায় থেকেছি-“
    — কবি তাঁর জীবনে হেমন্তের পাতা ঝরা থেকে শুরু করে বন্ধুদের সাথে আড্ডা, ঘোরাঘুরি বা শত্রুর আঘাতের জন্য যে সময় ব্যয় করেছেন, তাকে অত্যন্ত সাধারণ ও প্রাত্যহিক ‘অপেক্ষা’ হিসেবেই দেখেছেন।
  • অনন্ত প্রেমের মহিমা ও অটল বিশ্বাস:
    “আমি তোমার জন্যে পথপ্রান্তে অশ্বত্থের মতো / দাঁড়িয়ে থাকবো- … / দাঁড়িয়ে থাকতে-থাকতে / আমার পায়ে শিকড় গজাবে… / আমার প্রতীক্ষা তবু ফুরোবে না…”
    — কবিতার এই সমাপ্তি অংশটি প্রেমের এক চূড়ান্ত নিদর্শন। অশ্বত্থ গাছ যেমন যুগ যুগ ধরে স্থিরভাবে দাঁড়িয়ে থাকে, তেমনি কবিও অনন্তকাল ধরে তাঁর প্রেমিকার জন্য প্রতীক্ষা করতে প্রস্তুত। এই প্রতীক্ষায় তাঁর পায়ে শিকড় গজালেও সেই অপেক্ষার কোনো শেষ হবে না।

উৎস:

কবিতাটির মূল পাঠ ও প্রাসঙ্গিক তথ্যাবলি রফিক আজাদের কাব্যসংকলন এবং আপনার প্রদত্ত তথ্যসূত্র থেকে সতর্কতার সাথে সংগৃহীত ও বিন্যস্ত করা হয়েছে।

 

প্রতীক্ষা কবিতা আবৃত্তি ঃ

 

 

 

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।